Pages

Friday, November 23, 2018

মূর্তি পূজা কেন করা হয়? ঈশ্বর কে? দেবদেবী কে? ঈশ্বর ও দেব দেবীর মধ্যে পার্থক্য কি?


ঈশ্বর কে?

অনেকেই সনাতন ধর্মের মূর্তি পূজা নিয়ে প্রশ্ন করে।এ প্রশ্ন যে শুধু অন্য ধর্মের লোকেরা করে তাই নয় বরং অনেক সনাতন ধর্মালম্বীরাও করে।
আজ তাই আপনাদের কে মূর্তি পূজা কি এবং কেন তা কেনোই বা করা হয় তাই সনাতন দর্শনের আলোকে মাধ্যমে তুলে ধরব।
মূর্তি পূজার স্বরূপ জানতে হলে প্রথমে আমাদেরকে জানতে হবে ঈশ্বর ও দেবতা বলতে সনাতন দর্শনে কি বলা হয়েছে ঈশ্বর ও দেবতা
প্রথমেই বলে রাখা দরকার সনাতন দর্শনে বহু ঈশ্বরবাদের স্থান নাই বরং আমরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী।হিন্দু শাস্ত্র মতে,
ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।
সনাতন দর্শন বলে, ঈশ্বর স্বয়ম্ভূ অর্থাৎ ঈশ্বর নিজে থেকে উৎপন্ন, তার কোন স্রষ্টা নাই, তিনি নিজেই নিজের স্রষ্টা।
আমাদের প্রাচীন ঋষিগন বলে গিয়েছেন, ঈশ্বরের কোন নির্দিষ্ট রূপ নেই(নিরাকার ব্রহ্ম)তাই তিনি অরূপ, তবে তিনি যে কোন রূপ ধারন করতে পারেন কারণ তিনিই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সর্ব ক্ষমতার অধিকারী।

ঋকবেদে বলা আছে ঈশ্বর “একমেবাদ্বিতীয়ম” – ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়।ঈশ্বর বা ব্রহ্ম(নিরাকার ব্রহ্ম)।ঈশ্বর সম্পর্কে আরও বলা হয়েছে তিনি “অবাংমনসগোচর” অর্থাৎ ঈশ্বরকে কথা(বাক), মন বা চোখ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, তিনি বাহ্য জগতের অতীত। ঈশ্বর সম্পর্কে আরো বলা আছে-
১. ছান্দেগ্য উপনিষদের ৬ নম্বর অধ্যায়ের ২ নম্বর পরিচ্ছেদের ১ নম্বর অনুচ্ছেদে আছে-
“একাম এবাদ্বিতীইয়ম”
অর্থ- “স্রষ্টা মাত্র একজনই দ্বিতীয় কেউ নেই”
২. শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ৬ নম্বর অধ্যায়ের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে আছে-
“না চস্য কসুজ জানিত না কধিপহ”
অর্থ- “সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের কোন বাবা মা নেই, তাঁর কোন প্রভু নেই,
তাঁর চেয়ে বড় কেউ নেই”
৩. “একং সদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি” (ঋকবেদ-১/৬৪/৪৬) অর্থাৎ “সেই এক ঈশ্বরকে পণ্ডিতগণ বহু নামে ডেকে থাকেন”
৪. যজুবেদের ৩২ নম্বর অধ্যায়ের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আছে-
“ন তস্য প্রতিমা আস্তি”
অর্থ- “সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কোন মূর্তি নেই”
৫. যজুবেদের ৪০ নম্বর অধ্যায়ের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আছে-
“সর্বশক্তিমান ঈশ্বর নিরাকার ও পবিত্র”
৬. “একং সন্তং বহুধন কল্পায়ন্তি” (ঋকবেদ-১/১১৪/৫) অর্থাৎ “সেই এক ঈশ্বরকে বহুরূপে কল্পনা করা হয়েছে”৭. “দেবানাং পূর্বে যুগে হসতঃ সদাজায়ত” (ঋকবেদ-১০/৭২/৭) অর্থাৎ “দেবতারও পূর্বে সেই অব্যাক্ত(ঈশ্বর) হতে ব্যক্ত জগতে উৎপন্ন লাভ করেছে”
৮. যজুবেদের ৪০.১ “এই সমস্ত বিশ্ব শুধু মাত্র একজন ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্টি ও পরিচালিত হচ্ছে।যিনি কখনই অন্যায় করে না অথবা অন্যায় ভাবে সম্পদ অর্জনের ইচ্ছা রাখে না”
৯. ঋগবেদ ১০.৪৮.৫ “ঈশ্বর সমস্ত পৃথিবীকে আলোকিত করেন। তিনি অপরাজেয় এবং মৃত্যুহীনও তিনি এই জগতের সৃষ্টিকারী”
১০. যজুর্বেদ সংহিতা -৩২.১১ “ঈশ্বর যিনি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল কিছুর মধ্যে তিনি অধিষ্ঠিত”
১১. ঋগবেদ সংহিতা -১০.৪৮.১ “ঈশ্বর যিনি সর্ব্বত্রই ব্যাপ্ত আছেন”
১২. “ঈশ্বর সকল ভূতপ্রাণীর হৃদয়ে বাস করেন” – শ্রীমদভগবদগীতা-১৮/৬১
আরো বলা আছে, তবে লেখা বড় হয়ে যাবে বলে, সবটা আর বল্লাম না।
ঈশ্বর কে?

ঈশ্বর এক কিন্তু দেবদেবী অনেক। তাহলে দেব দেবী কারা ?
মনে রাখতে হবে দেবদেবীগণ ঈশ্বর নন। ঈশ্বরকে বলা হয় নির্গুণা অর্থাৎ জগতের সব গুনের আধার তিনি। আবার ঈশ্বর সগুনও কারণ সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর চাইলেই যে কো্নো গুনের অধিকারী হতে পারেন এবং সেই গুনের প্রকাশ তিনি ঘটাতে পারেন। দেব দেবীগন সেই ঈশ্বরের এই সগুনের প্রকাশ।
অর্থাৎ ঈশ্বরের এক একটি গুনের সাকার প্রকাশই দেবতা। ঈশ্বর নিরাকার কিন্তু তিনি যে কোন রূপে সাকার হতে পারেন, আমাদের সামনেই কারণ, তিনি সর্ব ক্ষমতার অধিকারী। যদি আমরা বিশ্বাস করি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, তাহলে নিরাকার ঈশ্বরের সাকার গুনের প্রকাশ খুবই স্বাভাবিক।
তাই, ঈশ্বরের শক্তির সগুন রূপ- কালী, নবদুর্গা, কার্তিক ইত্যাদি।
বিদ্যা-সিদ্ধির সগুন রূপ- সরস্বতী, গণেশ ইত্যাদি।
ঐশ্বর্যের সগুন রূপ- লক্ষ্মী, কূবের ইত্যাদি।
মৃত্যুর সগুন রূপ- কালভৈরব, ভূতনাথ, যম ইত্যাদি।
তেমনি ঈশ্বর যখন সৃষ্টি করেন তখন ব্রহ্মা (দেব)
যখন পালন করেন তখন বিষ্ণু (দেব)
আর প্রলয়রূপে শিব (দেব)
তিনি যখন আলোপ্রদান করেন তখন তিনি- সূর্য ও চন্দ্র
তিনি আবার পঞ্চ ভূত- ক্ষিতি, অপ, মরুৎ, বোম, তেজ
এই ভাবে নিরাকার ঈশ্বরের সাকার গুনের প্রকাশ হয়।
ঐতরেয় উপনিষদ ১.১ তে বলা আছে-
“সৃস্টির পূর্বে একমাত্র পরমআত্মা ছিল এবং সবকিছু ঐ পরমআত্মার মধ্যে স্থিত ছিল, সেই সময় দৃশ্যমান কিছুই ছিলনা। তখন পরমআত্মা স্বয়ং চিন্তা করলেন, আমি, আমি হইতে এই জগৎ নির্মাণ করব”
এর জন্য বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে সবই এক ঈশ্বরের অংশ। আর এই এক-একটি অংশ হল এক-একটি দেবদেবী।
যদি আমরা ভগবান শ্রী কৃষ্ণের বিশ্বরূপের ছবিটি দেখী, তাহলে খুব সহজে এটা বুঝে যাব। শ্রী কৃষ্ণের বিশ্বরূপের যতকটা মস্তক আছে, প্রতিটি মস্তক এক একটি দেবতা প্রকাশ করে অর্থাৎ ঈশ্বরের এক একটি গুনের প্রকাশ করে। এবার প্রশ্ন তাহলে কয়টা মস্তক ছিল ? অর্জুন এখানে বলেছিল শ্রী কৃষ্ণের বিশ্বরূপের কোনো সীমা ছিল না অর্থ্যাৎ তার শুরু আর শেষ ছিলনা অর্থ্যাৎ অসীম, এটাই হল ঈশ্বরের নির্গুণা হবার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কারণ ঈশ্বরের গুনের সংখ্যা অসীম অর্থ্যাৎ নির্গুণা।
এজন্য বলা হয়ে থাকে ঈশ্বরই ব্রহ্মা, তিনিই বিষ্ণু, তিনিই শিব এইভাবে।
তাহলে আমারা এখন বুঝতে পারছি দেবদেবী অনেক হতে পারে কিন্তু ঈশ্বর এক এবং দেবতাগণ এই পরম ব্রহ্মেরই বিভিন্ন রূপ।
এখানে ২ টি দেবের উদাহরণ দিচ্ছি ব্যাপারটা ভালো ভাবে বোঝার জন্য-
(১)বিষ্ণু , বিষ্-ধাতু থেকে উৎপত্তি যার অর্থ ব্যাপ্তি, অর্থ্যাৎ “সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছেন যিনি” এক কথাই “সর্ব্বং বিষ্ণুময়ং জগৎ” মানে সমগ্র জগৎ বিষ্ণুময়। এবার আমার প্রশ্ন কে সর্ব্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছেন? উওর ভগবান বা ঈশ্বর , ঋগবেদ সংহিতা -১০.৪৮.১ “ভগবান যিনি সর্ব্বত্রই ব্যাপ্ত আছেন”।
(২)শিব, শী-ধাতু থেকে উৎপত্তি যার অর্থ শয়ন, অর্থ্যাৎ যিনি সবকিছুর মধ্যে শায়িত বা অধিষ্ঠিত। এবার আমার প্রশ্ন কে সবকিছুর মধ্যে শায়িত বা অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন? উওর ভগবান বা ঈশ্বর , যজুর্বেদ সংহিতা -৩২.১১ “ভগবান যিনি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সকল কিছুর মধ্যে তিনি অধিষ্ঠিত”।
তাই হিন্দুরা বহু দেবোপাসক(বস্তুত দেবোপাসনা ঈশ্বর উপাসনাই) হতে পারে .... তবে বহু ঈশ্বরবাদী নন।
এতক্ষন আপনাদেরকে বললাম ঈশ্বর আর দেবতার পার্থক্য। এখন বলব তাহলে আমরা কেন এ সকল দেব দেবীগণের মূর্তি পূজা করি।
মূর্তি পূজার রহস্য ?
মানুষের মন স্বভাবতই চঞ্চল।পার্থিব জগতে আমাদের চঞ্চল মন নানা কামনা বাসনা দিয়ে আবদ্ধ। আমরা চাইলেই এই কামনা বাসনা বা কোন কিছু পাবার আকাংক্ষা থেকে মুক্ত হতে পারি না।(ধরুন একজন শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষা জীবনের বাসনা থাকে পরীক্ষায় প্রথম হউয়া।এ জন্য সে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা করে।) তীব্র গতির এই মনকে সংযত করা, স্থির করার ব্যবস্থা করা হয় এই সগুন ঈশ্বরের বিভিন্ন রুপের মাধ্যমে।
মনে রাখতে হবে আমরা কখনই ঈশ্বরের বিশালতা বা অসীমতা কে আমদের সসীম চিন্তা দিয়ে বুঝতে পারব না। বরং সর্বগুণময় ঈশ্বরের কয়েকটি বিশেষ গুনকেই বুঝতে পারব।আর এ রকম এক একটি গুনকে বুঝতে বুঝতে হয়ত কোন দিন সেই সর্ব গুণময়কে বুঝতে পারব।আর মূর্তি বা প্রতিমা হল এসকল গুনের রূপকল্প বা প্রতীক।
এটা অনেকটা গনিতের সমস্যা সমাধানের জন্য ‘x’ ধরা। আদতে x কিছুই নয় কিন্তু এক্স ধরেই হয়ত আমরা গনিতের সমস্যার উত্তর পেয়ে যাই। অথবা ধরুন জ্যামিতির ক্ষেত্রে আমরা কোন কিছু বিন্দু দিয়ে শুরু করি। কিন্তু বিন্দুর সংজ্ঞা হল যার দৈর্ঘ, প্রস্থ ও বেধ নাই কিন্তু অবস্থিতি আছে – যা আসলে কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।অথচ এই বিন্দুকে আশ্রয় করেই আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতা থেকে হিমালয়ের উচ্চতা সব মাপতে পারি। আবার ধরুন ভূগোল পড়ার সময় একটি গ্লোব রেখে কল্পনা করি এটা পৃথিবী আবার দেয়ালের ম্যাপ টানিয়ে বলি এটা লন্ডন, এটা ঢাকা এটা জাপান। কিন্তু ঐ গ্লোব বা ম্যাপ কি আসলে পৃথিবী? অথচ ওগুলো দেখেই আমরা পৃথিবী চিনছি।
তেমনি মূর্তির রূপ কল্পনা বা প্রতিমা স্বয়ং ঐসকল দেবতা নন তাঁদের প্রতীক, চিহ্ন বা রূপকল্প। এগুলো রূপকল্প হতে পারে কিন্তু তা মনকে স্থির করতে সাহায্য করে এবং ঈশ্বরের বিভিন্ন গুন সম্পর্কে ধারনা দেয়, শেখায় ঈশ্বর সত্য। সব শেষে পরম ব্রহ্মের কাছে পৌছাতে সাহায্য করে।
ঈশ্বর কে?

হিন্দু ধর্মে পূজা একটি বৈশিষ্ট্য। কল্পনায় দাড়িয়ে সত্য উত্তরণই পূজার সার্থকতা। আমাদের ধর্মে ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার উভয় রূপের উপাসনার বিধান আছে।নিরাকার ঈশ্বরের কোন প্রতিমা নাই, থাকা সম্ভবও না। যারা ঈশ্বরের অব্যক্ত বা নিরাকার উপাসনা করেন তাঁদের বলে নিরাকারবাদি। আর যারা ঈশ্বরের সাকার রূপের উপাসনা করেন তাঁরা সাকারবাদি।
এজন্য গীতায় বলা আছে, যারা নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনা করেন তারাও ঈশ্বর প্রাপ্ত হন।তবে নির্গুণ উপাসকদের কষ্ট বেশি। কারণ নিরাকার ব্রহ্মে মনস্থির করা মানুষের পক্ষে খুবই ক্লেশকর। কিন্তু সাকারবাদিদের সাকার ভগবানের উপর মনস্থির করা তুলনামূলক ভাবে সহজ। এই সাকার ভগবানের চাহিদা মেটাই “মূর্তি” গুলো। এছাড়া এই মূর্তিগুলি আমাদের পরম ঈশ্বরের বিভিন্ন গুণ ও কার্যকারীতা সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, ২ টি উদাহরণ দিচ্ছি ভালো ভাবে বোঝার জন্য –
(১)ব্রহ্মার ৪টি মাথা কেনো? কারন ভগবানের ঐ গুণবাচক নাম ব্রহ্মা অর্থ্যাৎ স্রস্টা যিনি ৪টি বেদের উৎপত্তি করেছিলেন , এই গুনটিকে বোঝাবার জন্য ব্রহ্মার মূর্তিতে ৪টি মস্তক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পূর্বে বেদ একটি ছিল পরে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস ঐ একটি বেদ কে, তাদের গুরুত্ব অনুসারে বিভাজন করে ৪টি বেদে পরিণত করেন, তাই বর্তমান ধারণা অনুসারে ব্রহ্মার ৪টি মাথা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এই ৪টি মাথা তো আর সত্য নয়, এই ৪টি মাথা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে ৪টি বেদের ব্যাপারে।
(২)শিবের তিনটি চোখ কেনো? কারন ভগবানের ঐ গুণবাচক নামে ৩টি গুণ-সত্ত্বঃ,রজোঃ ও তমোঃ প্রকাশ হচ্ছে। এর জন্য শিবের মূর্তিতে তিনটি চোখ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভগবান তো নির্গুণা, এখানে তিনটি চোখ এটাই বোঝাচ্ছে পরম ভগবান এই গোটা জগৎ কে এই ত্রিগুণ-সত্ত্বঃ, রজোঃ ও তমোঃ দিয়ে নির্মান করেছেন। অর্থ্যাৎ এই সম্পূর্ণ জগৎ তিনটি গুনের আধারে তৈরী।
তবে কি হিন্দুরা পৌত্তলিক ?
অন্য ধর্মের লোকেরা সনাতন দর্শন সম্পর্কে না জেনেই মূর্তি পূজা দেখে মন্তব্য করে বসেন হিন্দুরা পৌত্তলিক।
কিন্তু সঠিক দর্শন জানলে তাঁদের এ ভুল ধারনা ভাঙবে।
আগেই বলেছি আমাদের দেবতা অনেক কিন্তু ঈশ্বর এক।ঈশ্বরের কোন প্রতিমা নেই। দেবতারা হলেন ঈশ্বরের এক একটি রূপের বা গুনের প্রকাশ।মূর্তি বা প্রতিমা হল সে সকল গুনের প্রতীক, চিহ্ন বা রূপকল্প। সব ধর্মেই এমন রূপকল্প, চিহ্ন বা প্রতীক আছে, যা তাঁদের কাছে পবিত্র।
এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের একটি ঘটনার কথা বললে আপনারা ভালো ভাবে বুঝতে পারবেন।
পরিব্রাজক স্বামী বিবেকানন্দ তখন আলোয়ারের মহারাজের অতিথি । আলোয়ার রাজ কথা প্রসঙ্গে স্বামীজিকে জানালেন যে মূর্তি পূজায় তিনি বিশ্বাস করেননা । স্বামীজি একথা শুনে মহারাজার একটি চিত্র আনতে বললেন এবং রাজার দেওয়ানকে বললেন ওই ছবির উপর থুথু ফেলতে ।সমস্ত রাজসভা নিঃশব্দে এই দৃশ্য দেখতে লাগল । দেওয়ান স্বামিজির নির্দেশ পালনে অসমর্থ হলেন, তখন স্বামীজি বললেন, এই ছবি তো একটি রং করা কাগজ মাত্র, এই ছবি তো আর রাজা নয়, তাহলে এর উপর থুথু ফেলতে অসুবিধা কোথায় ? স্বামীজির বারংবার নির্দেশ সত্ত্বেও দেওয়ান যখন রাজার ছবিতে থুথু ফেলতে পারলেননা।
তখন স্বামীজি রাজাকে বুঝিয়ে বললেন, ফটোগ্রাফ তো একটি জড়বস্তু, একখণ্ড রং করা কাগজ মাত্র । তবু ওই ছবিটি আসল মানুষটিকে মনে করিয়ে দেয় । ছবিটির দিকে দেখলে আমরা ভাবিনা, যে নিছক কোনও রং করা কাগজ দেখছি । ঠিক তেমনই আমরা যখন মাটির মূর্তি পূজা করি আমরা মনে করি স্বয়ং ভগবানকেই পূজা করছি । আমরা সে সময় কখনও মনে করিনা আমরা কোনও জড় মূর্তি বা খড় বা মাটির উপাসনা করছি, আমরা দেবতার মূর্তিকে শুধুমাত্র প্রতীক মনে করি এর বেশি কিছু নয়। এজন্য পূজার সময় পূজারী ব্রাহ্মণগন মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় দেবতাগন ঐ প্রতিমায় ভাস্বর হয়ে উঠবেন।যদি মন্ত্রটির সংস্কৃত কে বাংলা করেন তো বুঝবেন মন্ত্রে কেবল পরম ঈশ্বরের ঐ সাকার গুণটিকে(দেবতা) বিভিন্ন ভাবে অনুরোধ করছে, ঐ মাটির মূর্তিতে স্থাপন হবার জন্য।
আবার কাঠমাটির প্রতিমা যে ঐ সকল দেবতা নয়, তার প্রমান মেলে পূজার পর প্রতিমা গুলোকে জলে বিসর্জন দিয়ে, যদি প্রতিমাকেই ঐ সকল দেবতা মনে করা হত তাহলে নিশ্চয় কেউ তা জলে বিসর্জন দিত না!
তাই হিন্দুর দেবমূর্তি পুতুল নয়, তা চিন্ময় ভগবানেরই প্রতীক। সনাতন ধর্মে ঈশ্বরের নিরাকার ও সাকার উভয় রূপের উপাসনার বিধান আছে।
এজন্য স্বামী বিবেকানন্দের বলেছেন- “পুতুল পূজা করে না হিন্দু, কাঠ মাটি দিয়ে গড়া, মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে, হয়ে যাই আত্মহারা’’
এখন প্রশ্ন আসতে পারে আমরা কেন তাহলে নিরাকার ঈশ্বরের পূজা না করে সাকার ঈশ্বরের পূজা করি?
জাগতিক মোহ থেকে সাকার পূজা করা হয়ে থাকে। আগেই বলেছি যে বিদ্যা চায়, তাহলে সে সরস্বতী দেবীর প্রার্থনা করে, যে অর্থ চায় সে লক্ষ্মী দেবীর প্রার্থনা করে, তেমনি যে বিভিন্ন বাধা বিপত্তি থেকে উদ্ধার চায় সে কালী পূজা করে।
এজন্য গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, শ্রীমদভগবদগীতা ৭.২০
শ্লোক-
“কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেহন্যদেবতাঃ।
তাং তাং নিয়মমাস্থায় প্রকৃ্ত্যা নিয়তাঃ স্বয়া।।”
অনুবাদ-
“জড় কামনা-বাসনায় দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে তারা অন্য দেবদেবতার শরণাগত হয় এবং তাদের স্বীয় স্বভাব অনুসারে বিশেষ নিয়ম পালন করে দেবতাদের উপাসনা করে”
মানুষ মাত্রই জড় কামনা-বাসনা দ্বারা জড়িত তাই তারা মূর্তি নির্মিত দেবতাদের উপাসনা করছে ও করবেও ।দেবতার রূপ ও গুন মানুষের বিচিত্র রুচিকে তৃপ্ত করে ও চঞ্চল মনকে অচঞ্চল করতে সহায়তা করে।
উদাহরণ –
একমাত্র মন্দির বা উপাসনালয়ে গেলে মনে পবিত্রতা আসে, মন প্রাশান্ত হয়,মনে ভক্তি জেগে ওঠে।অথচ ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান।তাহলে কেন শুধুমাত্র মন্দিরে গেলেই মনে বেশি ভক্তিভাব আসে।আসলে জাগতিক মোহে আবদ্ধ হয়ে আমরা ঈশ্বরের এই সর্ববিরাজমানতা ভুলে যাই।
আর যারা সবস্থানে ঈশ্বরের এই অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন তারাই নিরাকার উপাসনার যোগ্য। তেমনি একটি ছোট বাচ্চাকে কিংবা কোন অজ্ঞ ব্যক্তিকে নিরাকার ঈশ্বর সম্পর্কে ধারনা দিবেন সে বুঝবে না! বরং সে সহজে বুঝবে সাকার দেবতারূপ ঈশ্বরকে।এই সাকার রূপের প্রতিমা দেখে সহজেই বুঝতে শিখবে ঈশ্বরের গুনের কথা, শক্তির স্বরূপ সম্পর্কে ।এভাবে শুরুতে সাকার উপাসনার মধ্য দিয়েই নিরাকার উপাসনার যোগ্যতা অর্জন করতে হয় আমাদের। তাই কেউ যদি এক লাফে নিরাকারবাদি হতে চাই, তাহলে তাকে যথেস্ট আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও দার্শনিক জ্ঞান সম্পন্না হতে হবে। তবে সব কিছুই যেহেতু সেই অসীমেরই অংশ তাই শ্রদ্ধা সহকারে দেবতার পুজাও পরোক্ষভাবে ঈশ্বরের উপাসনা। এজন্য সনাতন সংস্কৃতিতে দেখা যায় শুধু মাত্র দেবতা নয় উদ্ভিদ, উপকারী প্রাণী এমনকি মনুষ্য পুজাও করে থাকেন অনেকে, এছাড়াও উপকারী উদ্ভিদ ও প্রাণীদেরও অনেক সময় উপকারীতা ব্যাক্ত করার জন্য অথবা পরিবেশের উপকারীতা ব্যাক্ত করার জন্য, তাদের কেও পূজা করা হয়ে থাকে।এটা যেমন এক দিক দিয়ে পরোক্ষভাবে ঈশ্বরের উপাসনা ও আরেক দিক দিয়ে উপকারীতা ব্যাক্ত করার একটি পদ্ধতি, এইছাড়া এতে অনেক পৌরাণিক ব্যাখা আছে ।
তবে দেবোপাসনায় কাম্য বস্তু লাভ হলেও ঈশ্বর লাভ হয় না।শুধুমাত্র পরম ঈশ্বরের উপাসনাতেই ঈশ্বর লাভ হয়।
এজন্য গীতায় শ্রীকৃষ্ণ
বলেছেন- শ্রীমদভগবদগীতা ৯.২৫
শ্লোক-
যান্তি দেবব্রতা দেবান পিতৃন যান্তি পিতৃব্রতাঃ ।
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা যান্তি মদযাজিনোহপি মাম।।
অনুবাদ-
“দেবতাদের উপাসকেরা দেবলোক প্রাপ্ত হবে, পিতৃপুরুষদের উপাসকেরা পিতৃলোক
লাভ করে, ভূত-প্রেত আদির উপাসকেরা ভূতলোক লাভ করে এবং আমার (ঈশ্বরের)উপাসকেরা আমাকেই(ঈশ্বরকে) লাভ করে”
সরল অর্থ-
হে অর্জুন! দেবোপাসকগন দেবগনকে প্রাপ্ত হয়। দেবগন পরিবর্তিত সত্তা।
তারা নিজেদের সদকর্মানুসারে জীবন অতিবাহিত করে। পিতৃগনের পূজকগন পিতৃগনকে প্রাপ্ত হন অর্থাৎ অতীতের মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকে।ভূতোপাসকগন ভূত হন অর্থাৎ জীবদেহধারণ করেন এবং আমার (ঈশ্বরের)ভক্ত আমাকেই(ঈশ্বরকে) লাভ করেন।
এখানে মূর্তি বা ভগবত বিগ্রহ প্রতীক বটে তবে মূর্তি পূজা সম্পর্কে এটাই শেষ কথা নয়।
সাধনা যাত্রার প্রারম্ভে শ্রীমূর্তি হতে পারে কিন্তু সাধনার পরিনতিতে উহা চিন্ময় সত্তা। প্রতীক রুপটি চিন্ময় রুপে পরিনতি হলেই পূজা সার্থক হয়।যিনি একদিন ছিলেন অপরিচিত লোক – তারই সঙ্গে বহু মেলামেশার পর যেমন তিনি হয়ে ওঠেন পরম বন্ধু – সেইরুপ, প্রতীক রূপে যে মূর্তির হয় প্রতিষ্ঠা, ভক্তের অর্চনার ফলে তিনিই হয়ে ওঠেন সাক্ষাৎ ভগবান।
আচার্য রামানুজের কথায় যা হল “অরচ্চাবতার” এবং এই ভাবে সেই ভক্ত শ্রীমূর্তি থেকে পরম চিন্ময় সত্তা কে বোঝে এবং একসময় “সর্বভূতে ঈশ্বরের অনুভুতি লাভ করে” অর্থাৎ “পরম ঈশ্বর কে লাভ করে” অর্থাৎ “স্ব-আত্মা সাথে পরমআত্মার সংযোগ” ।
শূধুমাত্র এই অংশটুকু সংঘটিত হতে সময় লাগতে পারে কয়েক দিন বা কয়েক মাস বা কয়েক বছর আবার এই জন্মেও না হতে পারে। এটা নির্ভর করে সম্পূর্ণ নিজের উপর।
এই প্রসঙ্গে আচার্য রামানুজের একটি ঘটনার কথা বললে আপনারা বুঝতে পারবেন।
আচার্য রামানুজের কাছে একদিন এক মূর্তি পুজায় আস্থাহীন ব্যক্তি এসে উপস্থিত হন।তিনি আচার্যকে জিজ্ঞেস করেন, ব্রহ্ম বিশ্ব ব্যাপী, তাকে পূজা করার জন্য আপনি ছোট ছোট কতগুলি পিতলের মূর্তি রেখেছেন কেন? আচার্য বললেন, আমার ধুনি জ্বালাবার জন্য আগুনের দরকার, আপনি গ্রাম হতে আমাকে আগুন এনে দিন , তারপর আপনার প্রশ্নের জবাব দিব।
ঐ লোকটি একখানা কাঠে আগুণ নিয়ে উপস্থিত হলেন। আচার্য তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এক খণ্ড দগ্ধ কাঠ এনেছেন কেন? যা বলেছি তাই আনুন। আগুন বলেছি আগুন আনুন। আগুন সকল বস্তুর মধ্যেই আছে। আপনার হাত ঘষে দেখুন, হাতের মধ্যেও আগুন আছে। আপনি আমার জন্য একটু খাটি আগুন আনুন। পোড়া কাষ্ঠ চাই না।
আচার্যের কথা শুনে লোকটি বললেন, অগ্নি সব বস্তুর মধ্যেই আছে কিন্তু আপনার নিকট আনতে হলে কাষ্ঠ ছাড়া উপায় দেখি না।
তখন আচার্য বললেন, সকল বস্তুর মধ্যে নিহিত অগ্নিকে আমার নিকট আনতে হলে কাষ্ঠ ছাড়া উপায় দেখেন না- আমিও সেই রূপ সর্বভুতস্থ সর্বব্যাপী পরম ব্রহ্মকে আমার নিকটতম আনতে চাইলে, মূর্তিকে আরোপ ছাড়া উপায় দেখি না। আপনার হাতের কাষ্ঠ খানা আগে ছিল কাষ্ঠ কিন্তু তাতে অগ্নি ধরাবার পর তা হয়ে উঠেছে অগ্নি, তেমনি আমার নিকটস্থ এই ঠাকুরটি এক সময় ছিলেন পিতল নির্মিত মূর্তি এখন সেটি চিন্ময় ব্রহ্ম। ইহা সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ।
নারায়ণ যেমন অযোধ্যায় এসেছিলেন রাম রূপে, তিনি আজ আমার দুয়ারে এসেছেন ‘অরচ্চাবতার’ রূপে। আচার্যের উক্তিটি জিজ্ঞাসু ব্যক্তিটির সকল সংশয় দূর করে দিল।
তাহলে কি ঈশ্বর আমাদের মূর্তিপূজা্র অনুমতি দিয়েছে ?
শ্রীমদভগবদগীতা ৭.২১ তে বলা হয়েছে-
“যো যো যাং যাং তনুং ভক্তঃ শ্রদ্ধয়ার্চিতুমিচ্ছতি ।
তস্য তস্যাচলাং শ্রদ্ধাং তামেব বিদধাম্যহম ।।”
“পরমাত্মারূপে আমি সকলের হৃদইয়ে বিরাজ করি। যখনই কেউ দেবতাদের পূজা করেতে ইচ্ছা করে, তখনই আমি সেই সেই ভক্তের তাতেই অচলা শ্রদ্ধা বিধান করি”
অর্থ্যাৎ-
ভগবান প্রত্যেককেই স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাই কেউ যদি জড় সুখভোগ করার জন্য কোন দেবতার পূজা করতে চাই, তখন সকলের অন্তরে পরমাত্মারূপে বিরাজমান পরমেশ্বর ভগবান তাদের সেই সমস্ত দেবতাদের পূজা করার সব রকম সুযোগ-সুবিধা দান করেন। সমস্ত জীবের পরম পিতা ভগবান কখনও তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন না, পক্ষান্তরে তিনি তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার সব রকম সুযোগ-সুবিধা দান করেন।
এরপর
শ্রীমদভগবদগীতা ৭.২২ তে বলা হয়েছে-
স তয়া স্রদ্ধয়া যুক্তস্তস্যারাধনমীহতে ।
লভতে চ ততঃ কামান্ময়ৈব বিহিতান হি তান ।।
সেই ব্যাক্তি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সেই দেবতার আরাধনা করে এবং সেই দেবতার কাছে থেকে আমারই(ভগবান) দ্বারা বিহিত কাম্য বস্তু অবশ্যই লাভ করে।
তাই হিন্দুদের মূর্তিপূজা করার স্বাধীনতার আছে। তাই কেউ যদি মূর্তি পূজা করে সেটাও হিন্দু ধর্ম সম্বত আর কেউ যদি মূর্তি না করে সেটাও হিন্দু ধর্ম সম্বত, কারন হিন্দু ধর্মে ভগবান সাকার ও নিরাকার উভয় মাধ্যমে পূজিত হয়।
হ্যাঁ তবে দেবদেবতার আরাধনা না করে এক ভগবানের আরাধনা করাই উৎকৃ্স্ট। কিন্তু এই উৎকৃ্স্ট পথে, এক লাফে যাওয়া কোনো দিনও সম্ভব নয়। এর জন্য প্রথমে সাকারবাদি হতে হবে তারপর নিরাকারবাদি।
তাই শুধু শাস্ত্র পড়লে হবে না এ জন্য দার্শনিকতা অপরিহার্য।
আশা করি সকলে মূর্তি পূজা কি এবং কেন করা হয় তা বুঝতে পেরেছেন।
যারা সনাতনিদের প্রতিমা পূজা কে পৌত্তলিক বলে,
তাঁদের দার্শনিক দারিদ্রতাই এখানে প্রবলভাবে ফুটে ওঠে।
কারণ সনাতন দর্শনেই সাকার ও নিরাকার উভয় ধরনের উপাসনার মাধ্যমে ঈশ্বর পূজিত হন, আর
এভাবে জগতের সকল মত আর পথকে সনাতন দর্শন তার অংশ করে নিয়েছে বলে সব পথেরই শেষ
একই ঠিকানা।

Thursday, November 15, 2018

কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়

জগদ্ধাত্রী দুর্গা- ‘জয় সর্বগত দুর্গে জগদ্ধাত্রি নমোহস্তুতে’! জগদ্ধাত্রীও নয়, দুর্গাও নয়, দুইয়ে মিলেই দেবীর স্বরূপে প্রকাশ। তা-ই যদি হয়, জগদ্ধাত্রীকে বলতে হবে দেবী দুর্গারই অন্য রূপমহিমা? সেই সূত্র ধরেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে- যাঁরা দুর্গাপূজা করে উঠতে পারেন না বা কোনও কালে পেরে ওঠেননি, তাঁরাই বেছে নিয়েছিলেন জগদ্ধাত্রী আরাধনার পথ ও পন্থা?দুর্গার সঙ্গে জগদ্ধাত্রীর এই বিকল্পের সংযোগ বুঝতে গেলে আমাদের একবার ভাল করে তাকাতে হবে দেবীর দিকে। তখন আমরা ধ্যানমন্ত্র অনুসরণ করে দেখব- এই মহাদেবী জগদ্ধাত্রী সিংহের স্কন্ধে আরূঢ়া, নানা অলঙ্কারে ভূষিতা ও নাগরূপ যজ্ঞোপবীতধারিণী। দেবীর বাম হস্তদ্বয়ে শঙ্খ ও শার্ঙ্গধনু, দক্ষিণ হস্তদ্বয়ে চক্র ও পঞ্চবাণ। রক্তবস্ত্রপরিহিতা সেই ভবসুন্দরী প্রভাতসূর্যের ন্যায় রক্তবর্ণা। নারদাদি মুনিগণ তাঁর নিত্যসেবা করে থাকেন- “সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্/চতুর্ভুজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্/শঙ্খশার্ঙ্গসমাযুক্তবামপাণিদ্বয়ান্বিতাম্/চক্রঞ্চ পঞ্চবাণাংশ্চ দধতীং দক্ষিণে করে/রক্তবস্ত্রাপরিধানাং বালার্কসদৃশীতনুম্/নারদাদ্যৈর্মুনিগণৈঃ সেবিতাং ভবসুন্দরীম্।”
দুর্গার সঙ্গে সংযোগটি তাহলে কোথায়? এ তো যেমনটি মূর্তিতে দেখে থাকি, প্রায় তেমন রূপবর্ণনাই! দুর্গার সঙ্গে জগদ্ধাত্রীর সংযোগ তাই যদি মন্ত্রের সূত্র ধরে খুঁজতে হয়, তবে তাকাতে হবে জগদ্ধাত্রীস্তোত্রের দিকে। তার তিন নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে- “জয়দে জগদানন্দে জগদেক প্রপূজিতে/জয় সর্ব্বগতে দুর্গে জগদ্ধাত্রি নমোঽস্তু তে।” আবার কিছু কিছু পুরাণ বলছে, মহিষাসুর বধের পর দেবতাদের উল্লাসের কথা। তাঁরা ভেবেছিলেন, দুর্গা যেহেতু তাঁদেরই সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ, তাই অসুর বধ হয়েছে তাঁদেরই যুগ্ম শক্তিতে। ব্রহ্মার বরের সম্মানরক্ষা করতে কেবল ওই নারীদেহটির আবশ্যিকতা। তাঁদের ওই গর্ব দেখে পরমেশ্বরী দেবী একটি তৃণখণ্ড অলক্ষ থেকে নিক্ষেপ করলেন দেবতাদের দিকে। পরীক্ষা করতে চাইলেন তাঁদের শক্তি। ইন্দ্র বজ্রদ্বারা সেই তৃণটি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হলেন। অগ্নি সেই তৃণ দহন করতে পারলেন না, বায়ু অসমর্থ হলেন তা উড়িয়ে নিয়ে যেতে। বরুণের শক্তি সেই তৃণটুকুর একটি অংশও জলস্রোতে প্লাবিত করতে পারল না। দেবতাদের এই দুরবস্থা দেখে তাঁদের সামনে আবির্ভূতা হল এক পরমাসুন্দরী সালঙ্কারা চতুর্ভুজা মূর্তি। তিনিই জগদ্ধাত্রী। জগদ্ধাত্রী এভাবে আবির্ভূতা হয়ে দেবতাদের জ্ঞানচক্ষুটি উন্মীলিত করলেন। বুঝিয়ে দিলেন, তিনিই এই জগতের ধারিণী শক্তি।
এই একই গল্প আমরা কেন উপনিষদ এবং কাত্যায়নীতন্ত্রেও দেখব। তফাতের মধ্যে কেন উপনিষদে দেবী প্রথমে দেখা দিয়েছিলেন এক যক্ষের বেশে। আর স্বরূপে আবির্ভূতা হওয়ার পর তাঁর নাম জানা গিয়েছিল উমা হৈমবতী। মহিষাসুর বধের কোনও প্রসঙ্গ সেখানে নেই। আবার, কাত্যায়নী তন্ত্রে উমা বা জগদ্ধাত্রী- কোনও নামটিই পাওয়া যায় না। সেখানে দেবী কেবল হৈমবতী অর্থাৎ স্বর্ণালঙ্কারভূষিতা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই উমা নামটির সূত্র ধরেই উপনিষদের গল্পটি গৃহীত হল অনেক পরে লেখা নানা পুরাণে। এবং, জগদ্ধাত্রীস্তোত্রের দুর্গা নামটির সূত্রে এল মহিষাসুর বধের প্রসঙ্গ।
কিন্তু, কোথাও খুব একটা স্পষ্ট করে বলা হল না জগদ্ধাত্রী দুর্গারই বিকল্প রূপ। কেন না, যে দেবী দেবতাদের গর্ব খর্ব করার জন্য রূপধারণ করলেন, উপনিষদ তাঁকে আদিশক্তিরূপেই ব্যাখ্যা করছে। পুরাণেও দুর্গার আবির্ভাবের আগে বেশ কয়েকবার এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে যিনি বিষ্ণুমায়া বা বৈষ্ণবী শক্তি হিসেবেই সুপরিচিতা। বিষ্ণুর মতো জগদ্ধাত্রীর হাতেও রয়েছে শঙ্খ এবং চক্র, অতএব এই দেবীর বিষ্ণুমায়া হওয়াটাই বেশি যুক্তিযুক্ত। আবার, বিষ্ণুর মতোই তিনিও ধারণ ও পালন করেন এই বিশ্ব। তাহলে?
জগদ্ধাত্রী যে দুর্গারই বিকল্প রূপ, তার প্রথম সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া গেল শ্রীশ্রীচণ্ডীতে এসে। সেখানে বলা হল, যুদ্ধের সময় মত্ত মহিষাসুর নানা মায়ারূপ ধরে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন দেবীকে। একবার সেই প্রচেষ্টায় মহিষাসুর ধারণ করেন হস্তীরূপ। সেই হস্তী দেবীকে বধের চেষ্টা করলে দুর্গা ধারণ করেন এক চতুর্ভুজা মূর্তি। চক্রদ্বারা তিনি ছেদন করেন হাতির শুঁড়টি। সেই রূপটিই জগদ্ধাত্রীর। সেই জন্যই ধ্যানমন্ত্রে কোথাও উল্লেখ না থাকলেও মূর্তিতত্ত্বে আমরা দেখছি, জগদ্ধাত্রী বাহন সিংহ এক হস্তীর মৃত শরীরের উপর দাঁড়িয়ে। কখনও বা সেই সিংহ খেলা করে হস্তীর কাটা মাথা নিয়ে। সংস্কৃতে হাতির একটি নাম করী, সেই অনুসারে অসুরটির নাম করীন্দ্রাসুর। তাকে বধ করেন বলে জগদ্ধাত্রীর অপর নাম করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী।
জগদ্ধাত্রী পূজা

এভাবেই খুব ধীরে ধীরে জগদ্ধাত্রীর আদি মহিমা থেকে সরে এলাম আমরা। তিনি সত্ত্বগুণের প্রতীক, তাই প্রথম সূর্যের মতো তাঁর গায়ের রং। অর্থাৎ, দেবীর গাত্রবর্ণটি কমলা। কিন্তু, দুর্গার সঙ্গে তাঁর সংযোগ স্থাপন করে আমরা বর্তমানে তাঁর মূর্তিটি নির্মাণ করি তপ্তকাঞ্চনবর্ণ বা কাঁচা সোনার রঙে। কমলা রঙের জগদ্ধাত্রী প্রতিমা বর্তমানে এই বঙ্গে দুর্লভ। আবার কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর হুতোম প্যাঁচার নকশায় লিখছেন, সেই সময়ের বাবু কলকাতা দুর্গার মতো জগদ্ধাত্রী মূর্তিতেও স্থান দিয়েছে লক্ষ্মী-সরস্বতীকে- “বারোইয়ারি প্রতিমাখানি প্রায় বিশ হাত উঁচু–  ঘোড়ায় চড়া হাইল্যান্ডের গোরা, বিবি, পরী ও নানাবিধ চিড়িয়া, শোলার ফল ও পদ্ম দিয়ে সাজানো; মধ্যে মা ভগবতী জগদ্ধাত্রী-মূর্তি– সিঙ্গির গায়ে রূপুলি গিলটি ও হাতী সবুজ মখমল দিয়ে মোড়া। ঠাকরুণের বিবিয়ানা মুখ, রং ও গড়ন আদল ইহুদী ও আরমানী কেতা, ব্রহ্মা বিষ্ণু, মহেশ্বর ও ইন্দ্র দাঁড়িয়ে জোড়হাত ক’রে স্তব কচ্চেন।”
এই যে শুরু হল দুর্গার বিকল্প রূপে জগদ্ধাত্রীর আরাধনা, কালে কালে তা-ই জনপ্রিয় হল বঙ্গে। যার হোতা নিঃসন্দেহেই নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কেন না, দুর্গাপূজা করতে অসমর্থ হয়ে বিকল্পে জগদ্ধাত্রী আরাধনা বঙ্গে প্রথম প্রচলন করছেন তিনিই। কাহিনি বলছে, তখন বঙ্গের তখতে আসীন নবাব আলিবর্দি খাঁ। তাঁর রাজত্বকালে রাজার কাছ থেকে বারো লক্ষ টাকা নজরানা দাবি করা হয়। কৃষ্ণচন্দ্র তা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদে। ছাড়া পেয়ে রাজা যখন নদিপথে কৃষ্ণনগরে ফিরছেন, শুনতে পেলেন বিসর্জনের বাজনা। ভারাক্রান্ত হল তাঁর মন- এ বছর আর দুর্গাপুজো করা হয়ে উঠল না! জনশ্রুতি, সেই রাতেই রাজাকে স্বপ্নে দর্শন দেন জগদ্ধাত্রী। তাঁর পূজার নির্দেশ দেন যা দুর্গাপূজারই সমতুল! সেই ১৯৬৬ সাল থেকে কৃষ্ণনগরে দুর্গাপুজোর বিকল্পর হিসেবে প্রচলিত হল জগদ্ধাত্রীর পূজা। চন্দননগরেও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ। কৃষ্ণচন্দ্রের পূজায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফরাসিদের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরি শুরু করলেন তৎকালীন ফরাসডাঙা বা অধুনা চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পূজা। যা পরে বিকল্প এক উৎসবের আকার নিল।
আবার, এক দেবীর পূজায় অসমর্থ হয়ে জগদ্ধাত্রী আরাধনার প্রচলন দেখা যায় সারদামণির বংশেও। শোনা যায়, সারদামণির মা শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতি বছর প্রতিবেশি নব মুখুজ্যের বাড়ির কালীপুজোয় চাল পাঠাতেন। একবার ঝগড়ার জন্য মুখুজ্যেরা সেই চাল নিতে অস্বীকার করেন। শ্যামাসুন্দরীকে সেই রাতেই স্বপ্নে দর্শন দেন জগদ্ধাত্রী। ওই চালে তাঁর পূজার নির্দেশ দেন। সেই থেকে জয়রামবাটীতে সারদামণির বংশে জগদ্ধাত্রী পূজা বিখ্যাত।
তবে এই বিকল্প পূজার সূত্রে আরও কিছু সময় পিছিয়ে গিয়ে একবার জগদ্ধাত্রী আরাধনার দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। সেই ইতিহাস বলছে, জগদ্ধাত্রী পূজা প্রথমে কট্টর ভাবেই প্রচলিত ছিল ব্রাহ্মণদের মধ্যে। দেবী সত্ত্বগুণের প্রতীক যা ব্রাহ্মণদের একটি বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করা হয়। দেবীর গলায় থাকে নাগযজ্ঞোপবীত যা স্পষ্টভাবেই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের পরিচায়ক। আবার, মন্ত্রে এই দেবীকে সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। এখান থেকেই তৈরি হয়েছে বিকল্প এবং শ্রেণিবিভাগ। সত্ত্বগুণধারিণী জগদ্ধাত্রীর পূজা করবেন ব্রাহ্ণরা, রজোগুণধারিণী দুর্গার পূজা ক্ষত্রিয়রা এবং তমোগুণধারিণী কালীর পূজা অন্যরা। পরে ব্রাহ্মণদের এই জগদ্ধাত্রী আরাধনার সূত্রটি গ্রহণ করলেন বণিকশ্রেণি। দুর্গাপূজায় তাঁদের অধিকার নেই, কালীপূজা তন্ত্রসম্মত বলে সবার সামর্থ্য নয়, অতএব রইলেন কেবল এই জগদ্ধাত্রী দুর্গাই!
সেই ইতিহাস বহন করেই এখনও দুর্গাপূজার উৎসবের বিকল্প হিসেবেই জগদ্ধাত্রীর পূজার উৎসব দেখছি আমরা। সেই জন্যই এই পুজো সর্বজনীন হল না। রয়ে গেল কিছু কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের উৎসব হয়েই।
নিজেই ভেবে দেখুন না, কৃষ্ণনগর-চন্দননগরের বাসিন্দা না হলে কি জগদ্ধাত্রী পুজোয় ততটাও আনন্দ করি আমরা?

Friday, November 9, 2018

ভারতবর্ষের হিন্দিভাষী হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পূজা ছট্‌ পূজা

 ছট্‌ অর্থাৎ ছটা বা রশ্মির পূজা। এই রশ্মি সূর্য থেকেই পৃথিবীর বুকে আসে। সুতরাং এই পূজা আসলে সূর্যদেবের পূজা। প্রত্যক্ষভাবে ‘ছট;-এর পূজা হলেও এই পূজার সঙ্গে জড়িত আছেন স্বয়ং সূর্যদেব, আছেন মা গঙ্গা এবং দেবী অন্নপূর্ণা।পৌরাণিক কাহিনিতে রয়েছে — বর্ষার আগমন ঘটেছে। কিন্তু বৃষ্টি তেমন হয়নি। চাষিদের মাথায় হাত। মাঠের ফসল মাঠেই মারা যাচ্ছে। মা অন্নপূর্ণা ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকেন। সকল দেবতা মা অন্নপূর্ণার এহেন দুর্দশায় ব্যথিত। ঘরে ঘরে অন্নাভাব হাহাকার ওঠে। সূর্যের তাপ হ্রাস করে বাঁচার জন্য মা অন্নপূর্ণা সূর্যদেবের ধ্যান করতে শুরু করেন। তাতে হিতে বিপরীত হয়। সূর্যের প্রখর ছটায় মা অন্নপূর্ণা দিন দিন শ্রীভ্রষ্টা হয়ে ক্ষীয়মান হতে থাকেন। দেবলোকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দেবতারা সম্মিলিতভাবে সূর্যদেবের কাছে গেলে তিনি মা অন্নপূর্ণার এই দশার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন। এবং বলেন, মা অন্নপূর্ণা যেন গঙ্গাদেবীর আশ্রয় নেন। সূর্যদেব আরও বলেন, অস্তগমনকালে গঙ্গাদেবীর আশ্রয়ে থেকে কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে এবং সপ্তমীর উদয়কালে মা অন্নপূর্ণা গঙ্গাদেবীর আশ্রয়ে থেকে উদীয়মান ছটা বা রশ্মিকে দেখে আমার স্তব বা ১২টি নাম উচ্চারণ করলে আমার স্মরণকারীকে সমস্ত পৃথিবী অন্নে পূর্ণ হতে থাকল। মা অন্নপূর্ণা আবার তাঁর শ্রী ফিরে পান।
তাই ছট্‌ পূজা বা ব্রত একাধারে সূর্যদেব, মা অন্নপূর্ণা ও গঙ্গাদেবীর পূজা। বিজ্ঞানসম্মতভাবে বলা যায়, গঙ্গার জলে সেচ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে অনাবৃষ্টিতেও খেত-খামার অন্নে পূর্ণ হয় এবং স্বাভাবিকভাবে মনুষ্যসমাজে খাওয়া-পরার অভাব থাকে না। এই ব্রত পালনে সূর্যদেবের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি আমাদের জীবনে যেমন বিঘ্ননাশক, দুঃখনাশক, তেমনি সুখদায়ক ও অর্থ-বৈভবদায়ক।

Thursday, November 8, 2018

ভাইফোঁটা উৎসব

ভাইফোঁটা হিন্দুদের একটি উৎসব। এই উৎসবের পোষাকি নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া অনুষ্ঠান। কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে (কালীপূজার দুই দিন পরে) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বাঙালি হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, এই উৎসব কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ২য় দিনে উদযাপিত হয়। মাঝেমধ্যে এটি শুক্লপক্ষের ১ম দিনেও উদযাপিত হয়ে থাকে। পশ্চিম ভারতে এই উৎসব ভাইদুজ নামেও পরিচিত। সেখানে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পাঁচ-দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের শেষদিন। আবার, মহারাষ্ট্র, গোয়া ও কর্ণাটকে ভাইফোঁটাকে বলে ভাইবিজ। নেপালে ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে এই উৎসব পরিচিত ভাইটিকা নামে। সেখানে বিজয়াদশমীর পর এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব।

এই উৎসবের আরও একটি নাম হল যমদ্বিতীয়া। কথিত আছে, এই দিন মৃত্যুর দেবতা যম তাঁর বোন যমুনার হাতে ফোঁটা নিয়েছিলেন। অন্য মতে, নরকাসুর নামে এক দৈত্যকে বধ করার পর যখন কৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে আসেন, তখন সুভদ্রা তাঁর কপালে ফোঁটা দিয়ে তাঁকে মিষ্টি খেতে দেন। সেই থেকে ভাইফোঁটা উৎসবের প্রচলন হয়।
ভাইফোঁটার দিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে ছড়া কেটে বলে-
ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা॥
যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে যম হল অমর।
আমার হাতে ফোঁটা খেয়ে আমার ভাই হোক অমর॥
এইভাবে বোনেরা ভাইয়ের দীর্ঘজীবন কামনা করে। তারপর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ায়। ভাইও বোনকে কিছু উপহার বা টাকা দেয়।
অনেক সময় এই ছড়াটি বিভিন্ন পরিবারের রীতিনীতিভেদে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। অতঃপর, বোন তার ভাইএর মাথায় ধান এবং দুর্বা ঘাসের শীষ রাখে। এই সময় শঙ্খ বাজানো হয় এবং হিন্দু নারীরা উলুধ্বনি করেন। এরপর বোন তার ভাইকে আশীর্বাদ করে থাকে (যদি বোন তার ভাইয়ের তুলনায় বড় হয় অন্যথায় বোন ভাইকে প্রণাম করে আর ভাই বোনকে আশীর্বাদ করে থাকে)। তারপর বোন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি দ্বারা ভাইকে মিষ্টিমুখ করায় এবং উপহার দিয়ে থাকে। ভাইও তার সাধ্যমত উক্ত বোনকে উপহার দিয়ে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। পশ্চিম ভারতের ভাইবিজ একটি বর্ণময় অনুষ্ঠান। সেখানে এই উপলক্ষে পারিবারিক সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়। মহারাষ্ট্রে মেয়েদের ভাইবিজ পালন অবশ্যকর্তব্য। এমনকি, যেসব মেয়েদের ভাই নেই, তাঁদেরও চন্দ্র দেবতাকে ভাই মনে করে ভাইবিজ পালন করতে হয়। এই রাজ্যে বাসুন্দি পুরী বা শ্রীখণ্ড পুরী নামে একটি বিশেষ খাবার ভাইবিজ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করার রেওয়াজ আছে।
বোন চন্দন কাঠ জল দিয়ে ঘষে ( কেউ কেউ দইও মিশ্রিত করেন চন্দন কাঠের সাথে), নিজের কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে নিচের মন্ত্রটি পড়তে পড়তে তিনবার ফোঁটা দিয়ে দেয়।

Wednesday, October 31, 2018

শ্যামা কালী মায়ের পুজা ও দীপাবলী উৎসব



হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই ধর্মীয় উৎসবটি কালী পূজা নামেও পরিচিত। একইসঙ্গে উদ্যাপিত হয় দীপাবলী উৎসব। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনের মাধ্যমে ভক্তের জীবনে কল্যাণের অঙ্গীকার নিয়ে পৃথিবীতে আগমন ঘটে দেবী শ্যামা বা কালীর। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে শ্যামা দেবী শান্তি, সংহতি ও সংগ্রামের প্রতীক। হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীয্যের মধ্য দিয়ে শ্যামা পূজা উদযাপন করে। মন্ডপে মন্ডপে শ্যামা দেবীর পূজা আয়োজিত হয়।, শ্যামা মায়ের পূজা, আরতি, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় সঙ্গীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ নানা আয়োজন হয় এ পূজায়। একইসঙ্গে সন্ধ্যায় মন্দির, মন্ডপ ও ঘরে-ঘরে দীপাবলী উদযাপনের জন্য প্রদীপ প্রজ্জলন করা হয়।
অমাবস্যা রজনীর সমস্ত অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে আলোকিত করার অভিপ্রায়ে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের প্রতিটি ঘরে ঘরে উত্তোলন হয় প্রদীপ। পৃথিবীর সকল অন্ধকারের অমানিশা দূর করতেই এই আয়োজন। অশুভ শক্তির হাত থেকে প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে রক্ষা করতেই এই আলোকিত করা। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করার প্রয়াস মানুষ সেই আদিকাল থেকেই করে আসছে। এর মাধ্যমে অর্থাৎ জ্ঞানের অবস্থান এবং স্বর্গীয় পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কালী মাতার কাছে স্বামী-স্ত্রী সন্তান স্বজনের কল্যাণ এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় প্রার্থনা করে থাকে। দীপাবলীকে দেওয়ালি ছাড়াও দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা এবং যক্ষরাত্রি নামেও অভিহিত হয়। মহালয়ায় শ্রাদ্ধগ্রহণের জন্য যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্তে আগমন করেন বলে, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে উল্কা জ্বালানো হয়। এ কারণে এদিন আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানো হয়। কেউ কেউ রাত্রিতে নিজগৃহে দরজা-জানালায় মোতবাতি জ্বালায়, কেউ বা লম্বা বাঁশের মাথায় কাগজের তৈরি ছোট ঘরে প্রদীপ জ্বালায়।রামায়ন অনুসারে দীপাবলী দিনে ত্রেতা যুগে শ্রী রাম রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করেন। শ্রী রামের চৌদ্দ বছর পরের প্রত্যাবর্তনে সারা রাজ্যজুড়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রজারা খুশীতে শব্দবাজি করে। দীপাবলী মূলত পাঁচ দিনব্যাপী উৎসব। দীপাবলীর আগের দিনের চতুর্দশীকে বলা হয় ‘নরকা চতুর্দশী, এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর স্ত্রী সত্যভামা নরকাসুরকে বধ করেছিলেন। চতুর্দশী পরের অমাবস্যা তিথি দীপাবলী উৎসবের দ্বিতীয় দিন, কিন্তু এই দিনই মূল হিসেবে উদযাপিত হয়। এই দিন রাতে শক্তি দেবী কালীর পূজা করা হয়। বিষ্ণুপুরান মতে, বিষ্ণুর বামন অবতার অসুর বলিকে পাতালে পাঠান, দীপাবলী দিনে পৃথিবীতে এসে অন্ধকার ও অজ্ঞতা বিদূরিত করতে, ভালবাসা ও জ্ঞানের শিখা প্রজ্বলিত করতে অসুর বলিকে পৃথিবীতে এসে অযুদ অযুদ প্রদীপ জ্বালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। দীপাবলীর তৃতীয় দিন-কাল কার্তিকা শুদ্ধ। এই দিন অসুর বলি নরক থেকে বেরিয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে বিষ্ণুর বরে পৃথিবী শাসন করে। চতুর্থ দিন হচ্ছে ভ্রাতৃ দ্বিতীয়া। একে যম দ্বিতীয়াও বলা হয়। এই দিন বোনেরা ভাইকে নিমন্ত্রণ করে, কপালে ফোটা দেয়, হাতে রাখী বেঁধে দেয়।
দীপাবলীর রাতে অনুষ্ঠিত হয় শ্যামা কালী পূজা। হিন্দু পুরাণ মতে কালী দেবী দুর্গারই একটি শক্তি। সংস্কৃত ভাষার ‘কাল’ শব্দ থেকে কালী নামের উৎপত্তি। কালী পূজা হচ্ছে শক্তির পূজা। জগতের সব অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভশক্তির বিজয়ের মধ্যেই রয়েছে কালী পূজার মাহাত্ম্য। কালী দেবী তার ভক্তদের কাছে শ্যামা, আদ্য মা, তারা মা, ভদ্রকালী, দেবী মহামায়াসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।


Saturday, October 27, 2018

বগলামুখী বা বগলা হলেন হিন্দু দশমহাবিদ্যা


বগলামুখী বা বগলা  হলেন হিন্দু দশমহাবিদ্যা

মন্ত্র ওঁ হ্ল্রীঁ বগলামুখী সর্বদুষ্টানাং 
বচং মুখং পাদং স্তম্ভয় জিহ্বাং কীলয়
বুধীং বিনাশয় হ্ল্রীঁ ওঁ স্বাহা
অস্ত্র মুগুর
বাহন মৃতদেহ বা প্রেত
বগলামুখী বা বগলা (দেবনাগরী: बगलामुखी) হলেন হিন্দু দশমহাবিদ্যা দেবমণ্ডলীর অন্তর্গত অন্যতম দেবী। তিনি ভক্তের মানসিক ভ্রান্তি নাশের (অথবা শত্রু নাশের) দেবী। তাঁর অস্ত্র মুগুর। উত্তর ভারতে তিনি পীতাম্বরী নামেও পরিচিত।

মূর্তিতত্ত্ব
"বগলামুখী" শব্দটি "বগলা" (অর্থাৎ, ধরা) এবং "মুখ" শব্দদুটি থেকে উৎপন্ন। এই শব্দটির অর্থ যিনি যাঁর মুখ কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে সমর্থ। অন্য একটি অর্থে, যিনি মুখ তুলে ধরেছেন।
বগলামুখীর গায়ের রং সোনালি এবং তাঁর কাপড়ের রং হলুদ। তিনি হলুদ পদ্মের ভরা অমৃতের সমুদ্রের মাঝে একটি হলুদ সিংহাসনে বসে থাকেন। তাঁর মাথায় অর্ধচন্দ্র শোভা পায়। দুটি পৃথক বর্ণনার একটিতে তাঁকে দ্বিভূজা ও অপরটিতে তাঁকে চতুর্ভূজা বলা হয়েছে।
বগলামুখীর দ্বিভূজা মূর্তি পূজার প্রচলনই বেশি। এই মূর্তিটিকে সৌম্য মূর্তি ধরা হয়। এই মূর্তিতে তাঁর ডান হাতে থাকে গদা। এই গদা দিয়ে তিনি শত্রুকে প্রহার করেন। অন্যদিকে বাঁহাতে শত্রুর জিভটি টেনে ধরে থাকেন। এই মূর্তিটিকে অনেক সময় "সম্ভন" (শত্রুকে নিস্তব্ধ করে দিয়ে তাকে শক্তিহীন করা) প্রদর্শন হিসেবে ধরা হয়। এই বর লাভের জন্য ভক্তেরা তাঁর পূজা করে থাকে। অন্যান্য মহাবিদ্যাদেরও এই শক্তি আছে বলে ধরা হয়।
বগলামুখীকে" "পীতাম্বরা দেবী" বা "ব্রহ্মাস্ত্র-রূপিণী"ও বলা হয়। তিনি একটি গুণকে বিপরীত গুণে পরিবর্তন করে পারেন বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন। যেমন, তিনি বাক্যকে নিঃস্তব্ধতায়, জ্ঞানকে অজ্ঞানে, শক্তিকে শক্তিহীনতায়, পরাজয়কে জয়ে পরিবর্তন করেন।

বগলামুখী দেবী সম্পর্কে একটি গল্প প্রচলিত আছে : একসময় পৃথিবীতে একটি ভয়ংকর ঝড় হয়। এই ঝড়ে যখন সকল সৃষ্টি ধ্বংসের সম্মুখীন হয়, তখন সকল দেবতা সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে একত্রিত হন। সেই সময় দেবী বগলামুখী হরিদ্রা সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে দেবতাদের স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে সেই ঝড় থামিয়ে দেন। ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের দাতিয়া অঞ্চলের পীতাম্বরা পীঠমে হরিদ্রা সরোবরের অনুরূপ একটি হ্রদ রয়েছে।

ভারতের অসম রাজ্যের গুয়াহাটিতে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির তন্ত্রবিদ্যার কেন্দ্রস্থল। এখানে দশমহাবিদ্যার মন্দির আছে। এই মন্দিরের কয়েক মাইল দূরেই বগলামুখী মন্দিরের অবস্থান। উত্তর ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের বাণখণ্ডীতে, মধ্যভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের আগর মালব জেলার নলখেদা ও দাতিয়ার পীতাম্বরা পীঠে এবং দক্ষিণ ভারতের তামিল নাড়ু রাজ্যের তিরুনেলভেলি জেলার পাপানকুলাম জেলার কল্লাইদাইকুরিচিতে এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাতেও বগলামুখীর মন্দির আছে

Wednesday, October 24, 2018

লক্ষ্মীদেবী পূজার আগের কিছু সাধারন নিয়ম

সাধারণত কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে সারারাত জেগে থাকার বিধি আছে। এই পূজার সঙ্গে কৃষকদের একটা বড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই শোনা যায় সারারাত জেগে তারা ওইদিন শস্য পাহাড়া দেয়। সঙ্গে মার কাছে আশীর্বাদ চেয়ে নেওয়া হয়। আবার অনেকে মনে করেন, লক্ষ্মী দেবী চঞ্চলা তাই সারারাত জেগে তাকে পাহাড়া দেওয়া হয়, যাতে তিনি পালিয়ে না যান। এই কথা মা ঠাকুমাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। লক্ষ্মীদেবী ধনসম্পদ তাকেই দেন যে তার পুরো মর্যাদা দেয়। যে সেই ধনসম্পদ সমাজের কল্যাণে কাজে লাগায়। তাই লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা অত্যন্ত শুদ্ধ মনে করতে হয়। মা লক্ষ্মী অল্পেই খুশী হন। তাই এই পূজায় খুব একটা বাহুল্য নেই। যে যার সাধ্যমত পূজা করে। তবে পূজার আগে পূজার স্থান একদম পরিষ্কার করে নিন। তারপর সুন্দর করে আলপনা দিয়ে দিন। প্রতি ঘরের দরজায়, পূজার স্থানে লক্ষ্মীর পা অবশ্যই আঁকবেন। সেইদিন আলপনা মুছবেন না। তারপর পূজার জায়গা সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে, ধূপ, ধুনো, প্রদীপ জালিয়ে দিতে হয়।

লক্ষ্মীদেবী
পূজা শুরুর নিয়ম:-
সব আয়োজন পূর্ণ এবার পূজা শুরু। শুরুর আগে গঙ্গা জল ছিটিয়ে দিন নিজের ও সকলের মাথায় ও পূজার স্থানে। তারপর নারায়ণকে মনে মনে স্মরণ করে পূজা শুরু করুন। পূজার স্থানে একটি তামার পাত্রে জল রাখুন। এই জল সূর্য দেবতাকে অর্পণ করার জন্য। তিনি সকল শক্তির উৎস। তাকে ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার। তাই তাকে জল দেওয়া বাঞ্ছনীয়। তামার পাত্রে জল ঢালতে ঢালতেই সূর্যদেবতাকে স্মরণ করুন।
এরপর ঘট স্থাপনের পালা। মাটির একটি গোল ডেলা মত করে নিন, সমান করে নিন। তার ওপর ঘট বসান। এবং ঘটের সামনে একটু ধান ছড়িয়ে দিন। ঘটে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকুন সিঁদুর দিয়ে। ঘটের ওপর আমের পাতা রাখুন। পাতার সংখ্যা যেন বিজোড় হয়। আর পাতার ওপর তেল সিঁদুরের ফোঁটা দেবেন। ঘটে গঙ্গাজল দিয়ে তার ওপর আমের পাতা রাখুন। পাতার ওপর একটা হরিতকী, ফুল, দুব্বো, সব দিয়ে ঘট সাজান।ঘট স্থাপনের পর মাকে প্রণাম করার পালা। ধ্যান মন্ত্রে মা কে প্রণাম করুন। লক্ষ্মী পাঁচালীর বইয়ে এই মন্ত্র পাবেন। এই বই যেকোনো দশকর্মার দোকানে পেয়ে যাবেন। তবে এই মন্ত্র উচ্চারন একটু শক্ত। তাই যদি সঠিক উচ্চারন করতে না পারেন তাহলে মাকে মনে মনে স্মরণ করে প্রণাম জানাবেন।
মাকে প্রণাম করে এবার আহবান জানান। আহবান মন্ত্রও বইয়ে দেওয়া থাকে। না জানলে মাকে মনে মনে আহবান জানান। হাত নমস্কার করে চোখ বন্ধ করে, বলুন এসো মা আমার গৃহে প্রবেশ কর। আমার গৃহে অধিষ্ঠান কর। আমার এই সামান্য আয়োজন, নৈবিদ্য গ্রহণ কর মা। এইভাবে মাকে আহবান জানাবেন।
মা আপনার ঘরে প্রবেশ করছেন তাই মায়ের পা ধুয়ে দিন। মায়ের আঁকা পায়ে জলের ছিটা দিন। তারপর ঘটে আতপচাল, দুব্বো, ফুল ও চন্দন দিন। এরপর একে একে দেবীকে সব অর্পণ করুন। ফল, মিষ্টি যা কিছু আয়োজন করেছেন। তারপর ধূপ ধুনো দিন। অর্পণ করার পর এবার পুষ্পাঞ্জলি। হাতে ফুল নিয়ে পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র তিনবার উচ্চারন করুন। তারপর দেবীর বাহনকে ফুল দিন। এবং নারায়নকে স্মরণ করে ঘটে ফুল দিন। ও দেবতা ইন্দ্র ও কুবেরকে স্মরণ করে ঘটে ফুল দিন। তারপর দেবীকে প্রণাম করুন। এরপর সবশেষে লক্ষ্মীদেবীর পাঁচালী পড়ে পূজা শেষ করুন।তবে কয়েকটি কথা মাথায় রাখবেন। লক্ষ্মীদেবীর পূজায় কাঁসর ঘণ্টা এসব বাজাবেন না। এগুলিতে দেবী অসন্তুষ্ট হন। শুধু শাঁখ বাজান আর দেবীর ঘটে তুলসীপাতাও দেবেন না। আর দেবেন না লোহার বাসন। ব্যাস এই কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে শুদ্ধ মনে শুরু করে দিন পূজা। হোকনা আয়োজন সামান্য শুধু মন শুদ্ধ থাকলেই দেবী আসবেন ঘরে।

Sunday, October 21, 2018

শ্রীশ্রী কোজাগরীলক্ষ্মী পূজা


শ্রীশ্রী কোজাগরীলক্ষ্মী পূজা

আগামী ৬ কার্ত্তিক, বুধবার শ্রীশ্রী কোজাগরীলক্ষ্মী পূজা.মা লক্ষ্মীর ১০৮ নাম
.................................
১) প্রকৃতি ,২) বিক্রুতি , ৩) বিদ্যা , ৪) সর্বভূতহিতপ্রদা, ৫) শ্রদ্ধা , ৬) বিভূতি, ৭) সুরভি, ৮) পরমাত্মিকা , ৯) জয়প্রদা , ১০) পদ্মালয়া , ১১) পদ্মা , ১২) শুচী, ১৩) স্বাহা, ১৪) স্বাধা, ১৫) সুধা , ১৬) ধন্যা , ১৭) হিরন্ময়ী, ১৮) লক্ষ্মী , ১৯) নিত্যাপুষ্টা, ২০) বিভা, ২১) অদিত্যা, ২২) দিত্যা, ২৩) দীপা, ২৪) বসুধা, ২৫) ক্ষীরোদা, ২৬) কমলাসম্ভবা, ২৭) কান্তা, ২৮) কামাক্ষী, ২৯) ক্ষীরোদসম্ভবা , ৩০) অনুগ্রহাপ্রদা, ৩১) ঐশ্বর্য্যা , ৩২) অনঘা, ৩৩) হরিবল্লভী, ৩৪) অশোকা , ৩৫) অমৃতা, ৩৬) দীপ্তা, ৩৭) লোকাশোকবিনাশিনী, ৩৮) ধর্মনিলয়া, ৩৯) করুণা, ৪০) লোকমাতা, ৪১) পদ্মপ্রিয়া, ৪২) পদ্মহস্তা, ৪৩) পদ্মাক্ষী , ৪৪) পদ্মসুন্দরী, ৪৫) পদ্মভবা, ৪৬) পদ্মমুখী, ৪৭) পদ্মনাভপ্রিয়া, ৪৮) রমা, ৪৯) পদ্মমালাধরা , ৫০) দেবী,

৫১) পদ্মিনী, ৫২) পদ্মগন্ধিণী , ৫৩) পুণ্যগন্ধা, ৫৪) সুপ্রসন্না, ৫৫) শশীমুখী , ৫৬) প্রভা, ৫৭) চন্দ্রবদনা, ৫৮) চন্দ্রা , ৫৯) চন্দ্রাসহোদরী , ৬০) চতুর্ভুজা , ৬১) চন্দ্ররূপা , ৬২) ইন্দিরা, ৬৩) ইন্দুশীতলা, ৬৪) আহ্লাদিণী, ৬৫) নারায়নী , ৬৬) বৈকুন্ঠেশ্বরি ৬৭) হরিদ্রা ৬৮) সত্যা , ৬৯) বিমলা, ৭০) বিশ্বজননী, ৭১) তুষ্টি, ৭২) দারিদ্রনাশিণী, ৭৩) ধনদা , ৭৪) শান্তা, ৭৫) শুক্লামাল্যাম্বরা , ৭৬) শ্রী, ৭৭) ভাস্করী , ৭৮) বিল্বনিলয়া , ৭৯) হরিপ্রিয়া , ৮০) যশস্বীনি , ৮১) বসুন্ধরা , ৮২) উদারঙ্গা, ৮৩) হরিণী , ৮৪) মালিনী, ৮৫) গজগামিনী , ৮৬) সিদ্ধি , ৮৭) স্ত্রৈন্যাসৌম্যা , ৮৮) শুভপ্রদা, ৮৯) বিষ্ণুপ্রিয়া , ৯০) বরদা , ৯১) বসুপ্রদা, ৯২) শুভা , ৯৩)চঞ্চলা , ৯৪) সমুদ্রতনয়া , ৯৫) জয়া , ৯৬) মঙ্গলাদেবী, ৯৭) বিষ্ণুবক্ষাস্থলাসিক্তা , ৯৮) বিষ্ণুপত্নী, ৯৯) প্রসন্নাক্ষী , ১০০) নারায়নসমাশ্রিতা ,
১০১) দারিদ্রধ্বংসিণী, ১০২) কমলা, ১০৩) সর্বপ্রদায়িনী, ১০৪) পেঁচকবাহিণী, ১০৫) মহালক্ষ্মী, ১০৬) ব্রহ্মাবিষ্ণুশিবাত্মিকা , ১০৭) ত্রিকালজ্ঞানসম্পূর্ণা, ১০৮) ভুবনমোহিনী।
প্রাতঃকালে মা লক্ষ্মীর নিম্নলিখিত নাম উচ্চারনে দারিদ্রতা নিবারণ হয়ঃ-
লক্ষ্মীঃ শ্রীঃ কমলা বিদ্যা মাতা বিষ্ণুপ্রিয়া সতী ।
পদ্মালয়া পদ্মহস্তা পদ্মাক্ষী পদ্মসুন্দরী ।।
ভূতানামীশ্বরী নিত্যা মতা সত্যাগতা শুভা ।।
বিষ্ণুপত্নী মহাদেবী ক্ষীরোদতনয়া ক্ষমা ।।
অনন্তলোকলাভা চ ভূলীলা চ সুখপ্রদা ।
রুক্মিনী চ তথা সীতা মা বৈ বেদবতী শুভা ।
এতানি পুণ্যনামানি প্রাতরুত্থায় যঃ পঠেৎ ।
মহাশ্রিয়মবাপ্নোতি ধনধান্যমকল্মষম্ ।।
বঙ্গানুবাদ- শ্রী, কমলা বিদ্যা, মাতা, বিষ্ণুপ্রিয়া , সতী, পদ্মালয়া, পদ্মহস্তা, পদ্মাক্ষী , পদ্মসুন্দরী, ভূতগণের ঈশ্বরী, নিত্যা, সত্যাগতা , শুভা, বিষ্ণুপত্নী, ক্ষীরোদতনয়া, ক্ষমাস্বরূপা, অনন্তলোকলাভা , ভূলীলা, সুখপ্রদা, রুক্মিনী, সীতা, বেদবতী- দেবী লক্ষ্মীর এসকল নাম। প্রাতে উত্থান কালে যিনি দেবীর এই পুন্য নামাবলী পাঠ করেন, তিনি বিপুল ঐশ্বর্য ও নিস্পাপ ধনধান্য প্রাপ্ত হন ।

Saturday, October 20, 2018

কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো


কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো
 মা লক্ষ্মীর চারটি হাত। ধর্ম, কর্ম, অর্থ ও মোক্ষ— হিন্দুশাস্ত্রে এই চার হাতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করাহয়েছে এভাবেই। যাঁরা মনে করেন মা লক্ষ্মী শুধুমাত্র ধনের দেবী, তাঁরা সম্ভবত দেবীর এই ব্যাখ্যা সম্পর্কেঅবহিত নন।
সমুদ্রমন্থন থেকে উদ্ভব মা লক্ষ্মীর। কিন্তু সবার আগে জানা প্রয়োজন তিনি কে? কীভাবে আবির্ভূতহলেন তিনি। এই নিয়ে নানা মত রয়েছে। কখনও বলা হয় তিনি ছিলেন ঋষি ভৃগুর সন্তান এবং সমুদ্রমন্থনে তাঁর পুনর্জন্ম হয়। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, তিনি সমুদ্রদেব বরুণের কন্যা।
মা লক্ষ্মীরও আগে আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবী সরস্বতী। একটি পৌরাণিক গল্পে বলা হয়েছে, ব্রহ্মার সাত সন্তান, সপ্তঋষির মধ্যে ৬জনই দেবী সরস্বতীর আরাধনা করে দৈবজ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু প্রশ্ন তোলেন মহর্ষি ভৃগু। মানবশরীরের ক্ষুধা নিবারণ কীভাবে ঘটে, সেই খোঁজে তিনি বেরিয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত উত্তরটি পান সমু্দ্রদেববরুণের কাছে।
মহর্ষি ভৃগু তার পরেই উপলব্ধি করেন যে মগজের বা মননের পুষ্টিলাভ যেমন হয় দেবী সরস্বতীর আরাধনায় তেমনই নশ্বর শরীরের পুষ্টির জন্য মা লক্ষ্মীর আবাহন ও পূজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা লক্ষ্মীকে শুধুমাত্র ধনদেবী হিসেবে দেখলে তাঁর মহিমার সম্পূর্ণটা দেখা হয় না।
তাঁর আশীর্বাদ মানুষের ক্ষুধা নিবারণের জন্য, গৃহস্থের সার্বিক কল্যাণের জন্য। আর এই দুয়ের জন্যই প্রয়োজন অর্থের। কিন্তু সেই অর্থ পাওয়ার পরে মানুষ তার প্রয়োগ কীভাবে করছে, সেদিকে তাঁর কড়া নজর। অপচয় বা অন্যায় প্রয়োগ তিনি সইতে পারেন না, তাই তিনি চঞ্চলা।

যে মানুষ ধর্মের পথে থাকে, সৎকর্মের মাধ্যমে ধন উপার্জনে করতে যে তৎপর, তাঁকেই কৃপা করেন মা লক্ষ্মী। মোট ১৬ প্রকার সম্পদ প্রদান করেন তিনি— খ্যাতি, জ্ঞান, সাহস ও শক্তি, জয়, সুসন্তান, বীরত্ব, স্বর্ণ, অন্যান্য রত্নরাজি, শস্য, সুখ, বুদ্ধি, সৌন্দর্য, উচ্চাশা, উচ্চভাবনা, নৈতিকতা, সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘ জীবন।
আবার মা লক্ষ্মীর কৃপালাভের পরেও যে ধর্ম ও সৎকর্মের পথ থেকে বিচ্যুত হয় না, ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে উপার্জিত অর্থ মানুষের উপকারে ব্যয় করে, তারই প্রকৃত মোক্ষলাভ ঘটে।
অর্থাৎ একটি সুস্থ, সুন্দর, সৎ জীবনদর্শনের কথা উঠে আসে মা লক্ষ্মীর মহিমা বর্ণঁনায়। তাই দেবী অপরিচ্ছন্ন জায়গায় কখনও থাকেননা, নিয়মানুবর্তিতা, সুব্যবহার এবং পরিমিত জীবনযাপন পছন্দ করেন। বাংলায় লক্ষ্মীপুজোর সংস্কৃতি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের থেকে একটু অন্যরকম।
যেমন ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে শুক্রবার মহালক্ষ্মীর উপবাস রাখা হয় ও বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। ওদিকে বাংলার ঘরে ঘরে বৃহস্পতিবারই লক্ষ্মীবার। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো দক্ষিণ ভারত ও পূর্ব ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও উত্তর ও পশ্চিম-ভারতে মা লক্ষ্মীর আবাহন মূলত হয় ধনতেরাস-দিওয়ালি তিথিকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু বছরে মাত্র একটি বা দু’টি দিন নয়, শাস্ত্রজ্ঞরা বলেন যে ধারাবাহিকভাবে, যদি সারা বছরই কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করা যায় এবং ভক্তিভরে কিছু নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ করা যায়, তবে তাঁর কৃপালাভের পথ সুগম হয়।


ভক্তরা নানাভাবে দেবদেবীর আরাধনা করেন। হিন্দুধর্ম ও হিন্দু আচারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর বৈচিত্র যা অঞ্চলবিশেষে যেমন আলাদা, তেমনই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত মেটামরফোজড হয়ে চলেছে।
শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলেন, যত মত তত পথ, তেমনই আচার-অনুষ্ঠানের কোনও শেষ নেই এবং সেই সব পথই ধাবিত হয় ঈশ্বরের দিকে। মনে যদি ভক্তি থাকে, তবে যে পথেই আরাধনা করা হোক না কেন, ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা অবশ্যই পৌঁছয়। নীচে উল্লিখিত আচারগুলি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচলিত।
১. ঠাকুরঘরে বা ঠাকুরের সিংহাসনে কড়ি এবং শঙ্খ রাখা খুবই শুভ গৃহের কল্যাণের জন্য।
২. দক্ষিণাবর্ত শঙ্খকে বলা হয় মা লক্ষ্মীর শঙ্খ। লাল, সাদা বা হলুদ রংয়ের একটি পরিষ্কার কাপড়, একটি রুপোর পাত্র অথবা মাটির পাত্রের উপর রাখতে হয় এই শঙ্খ। এই শঙ্খের মধ্য দিয়েই মা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ প্রবাহিত হয় বাসস্থানে।
৩. প্রতিদিন মা লক্ষ্মীর প্রতিমা বা পটের সামনে দু’টি ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালালে তা মঙ্গল। এর সঙ্গে পদ্ম, নারকেল ও ক্ষীরের নৈবেদ্য দিলে প্রসন্ন হন দেবী।
 ৪. একটি বাঁশের বাঁশিকে সিল্কের কাপড়ে মুড়ে ঠাকুরের সিংহাসনে রাখলে মা লক্ষ্মী প্রসন্ন হন কারণ বাঁশিহল বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়। তাই মা লক্ষ্মীরও অতি প্রিয়।
 ৫. শুধুমাত্র পুজোর দিনে নয়, প্রতিদিনই যদি দেবীর পায়ের চিহ্ন আঁকা ভাল। প্রতিদিন না পারলে বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবার এবং মা লক্ষ্মীর পুজোর তিথি থাকলে তো অবশ্যই।
৬. যিনি প্রতি শুক্রবার পরমান্ন বা মিষ্ট অন্ন দিয়ে গোসেবা করেন তাঁর প্রতি বিশেষ প্রসন্ন হন দেবী।

৭. বলা হয় সমস্ত দেবতা বাস করেন তুলসি বৃক্ষে আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী দেবী তুলসি হলেন মা লক্ষ্মীরই এক রূপ। তাই বাড়িতে তুলসি বৃক্ষ থাকলে এবং সেখানে প্রতিদিন সেখানে প্রদীপ জ্বাললে তুষ্ট হন মা লক্ষ্মী।
 ৮. প্রতি শুক্রবার পদ্মমূল থেকে তৈরি নয়টি সলতে দিয়ে একটি মাটির প্রদীপ মা লক্ষ্মীর পট বা প্রতিমার সামনে জ্বাললে তা গৃহে প্রাচুর্যের সমাহার ঘটায়।
 ৯. ধারাবাহিকভাবে ১২ দিন ধরে সম্পূর্ণ ভক্তিভরে লক্ষ্মী দ্বাদশ স্তোত্র ১২ বার উচ্চারণ করলে ঋণমুক্তি ঘটে।
 ১০. প্রতিদিন স্নান করে শুদ্ধ হয়ে লক্ষ্মী গায়ত্রী মন্ত্র ১০৮ বার জপ করলে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন মা লক্ষ্মী। এই মন্ত্র জপ করার সময় পদ্মবীজের মালা ব্যবহার করলে ভাল।
১১. এছাড়া টানা ৩০ দিন ধরে মা লক্ষ্মীর প্রতিমা বা পটের সামনে নিষ্ঠাভরে শ্রী সুক্ত পাঠ করলে বিশেষ প্রসন্ন হন দেবী। শ্রী সুক্ত হল ১৫টি ভার্সের একটি সম্মেলন।


 লক্ষ্মীপূজায় নিষিদ্ধ বিষয় : লক্ষ্মীপূজায় লোহা বা স্টিলের বাসনকোসন ব্যবহার করবেন না। লোহা দিয়ে অলক্ষ্মী পূজা হয়। তাই লোহা দেখলে লক্ষ্মী ত্যাগ করে যান।লক্ষ্মীপূজায় ঘণ্টা বাজাতে নেই। লক্ষ্মীকে তুলসীপাতা দিতে নেই। কিন্তু লক্ষ্মীপূজার পর একটি ফুল ও দুটি তুলসীপাতা দিয়ে নারায়ণকে পূজা করতে হয়। লক্ষ্মীপূজা সাধারণত সন্ধ্যাবেলা করে, তবে অনেকে সকালেও করে থাকেন। সকালে করলে সকাল ন-টার মধ্যেকরে নেওয়াই ভাল। পূজার পর ব্রতকথা পাঠ করতে হয়।

কিছু বিষয় : লক্ষ্মীপূজা প্রতিমা, সরা বা লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে হয়ে থাকে। পূর্ববঙ্গীয়রা সাধারণত সরা বা প্রতিমায় লক্ষ্মীপূজা করেন, পশ্চিমবঙ্গীরা লক্ষ্মীর ধানপাত্রে বা ঘটে পূজা করেন। কারো কারো বিশেষ পারিবারিক লক্ষ্মীপ্রতীক রয়েছে। যাঁর যা আছে, বা যাঁদের যা নিয়ম তাঁরা তাতেই লক্ষ্মীপূজা করবেন। পূজার পূর্বে পূজাস্থান পরিষ্কার করে নিয়ে ধূপ দীপ জ্বালিয়ে দেবেন। পূজাস্থানে লক্ষ্মীর পা-সহ আলপনা আঁকবেন। ঘটের পাশে একটি লক্ষ্মীর পা অবশ্যই আঁকবেন।
পূজার সময়অন্যমনস্ক হবেন না বা অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলবেন না। মনকে লক্ষ্মীতে স্থির রাখবেন। পূজার সময় অন্য কথা বললে বা অন্যমনস্ক হলে মন্ত্রপাঠাদি করে লক্ষ্মীপূজা করাই শ্রেয়। কিন্তু একমনে আন্তরিকভাবে লক্ষ্মীপূজা করলে বিনা মন্ত্রেই পূজা সিদ্ধ হয়। অবশ্য দীক্ষিত হলে গুরুমন্ত্রেও পূজা চলে। বিশেষভাবে মনে রাখবেন, মন্ত্রপাঠ ও পূজাক্রিয়াদিতেঅভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বিনা মন্ত্রে পূজা করবেন না। বিনা মন্ত্রে পূজা শুধু সেই সবে অনভিজ্ঞদের জন্য।
লক্ষ্মীপূজা বৃহস্পতিবার মাত্রেই করা যায়। তার জন্য তিথি নক্ষত্রের বিচার করতে হয় না। তাই যাঁরা প্রবাসী তাদের ভারতীয় বা বাংলাদেশী সময় মিলিয়ে পূজা না করলেও চলবে, যেদেশে যেমন বৃহস্পতিবার পড়বে, সেই দেশে তেমনই করবে।
তাছাড়া শাস্ত্রে আছে, প্রবাসে নিয়মং নাস্তি। তাই প্রবাসী হলে রবিবার বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও লক্ষ্মীপূজা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পূজার আগে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলে নেবেন, মা বৃহস্পতিবার পূজা করতে পারলাম না, আজ পূজা নাও। ভারত বা বাংলাদেশবাসী হলে বৃহস্পতিবারের পূজা বৃহস্পতিবারেই করবেন।

Tuesday, October 16, 2018

শারদীয়া দুর্গাপূজা


দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল হিন্দু দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি উৎসব। দুর্গাপূজা সমগ্র হিন্দুসমাজেই প্রচলিত। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দুর্গাপূজা ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল সহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ার দরুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যে ও বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। এমনকি ভারতের অসম,বিহার, ঝাড়খণ্ড,মণিপুর এবংওড়িশা রাজ্যেও দুর্গাপূজা মহাসমারোহে পালিত হয়ে থাকে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবাসী বাঙালি ও স্থানীয় জনসাধারণ নিজ নিজ প্রথামাফিক শারদীয়া দুর্গাপূজা ও নবরাত্রি উৎসব পালন করে। এমনকি পাশ্চাত্য দেশগুলিতে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালিরাও দুর্গাপূজা পালন করে থাকেন। ২০০৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে "ভয়েসেস অফ বেঙ্গল" মরসুম নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসেবে স্থানীয় বাঙালি অভিবাসীরা ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এক বিরাট দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।
সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে "দুর্গাষষ্ঠী", "মহাসপ্তমী", "মহাষ্টমী", "মহানবমী" ও "বিজয়াদশমী" নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় "দেবীপক্ষ"। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি প্রচলিত আছে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে মহাসপ্তমী থেকে বিজয়াদশমী পর্যন্ত (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মহাসপ্তমী থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত) চার দিন সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশে বিজয়াদশমীতে সর্বসাধারণের জন্য এক দিন এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৩ দিন সরকারি ছুটি থাকে।
পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা প্রধানত ধনী পরিবারগুলিতেই আয়োজিত হয়। কলকাতা শহরের পুরনো ধনী পরিবারগুলির দুর্গাপূজা "বনেদি বাড়ির পূজা" নামে পরিচিত। পারিবারিক দুর্গাপূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়-সমাগম হয়ে থাকে। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে এক একটি অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তা বারোয়ারি পূজা বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। মুলত দেবী দুর্গাকে মাথায় রেখেই দেশমাতা বা ভারতমাতা বা মাতৃভূমির জাতীয়তাবাদী ধারনা বিপ্লবের আকার নেয়। দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দে মাতরম গানটি রচনা করেন যা ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র। সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ বিল্পবী ও জাতীয়তাবাদী নেতারা বিভিন্ন সর্বজনীন পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। এখন সর্বজনীন পূজায় "থিম" বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপ, প্রতিমা ও আলোকসজ্জার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। থিমগুলির শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে "শারদ সম্মান" নামে বিশেষ পুরস্কারও দেওয়া হয়। এছাড়া বেলুড় মঠ সহ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিভিন্ন শাখাকেন্দ্র এবং ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিভিন্ন কেন্দ্রের সন্ন্যাসীরা দুর্গাপূজার আয়োজন করেন



Sunday, January 21, 2018

সুগন্ধা শক্তিপীঠ বাংলাদেশের বরিশালে অবস্থিত


সুগন্ধা শক্তিপীঠ

সুগন্ধায়ঞ্চ নাসিকা দেবস্ত্রম্ব্যকনামা চ সুনন্দা তত্র দেবতা ।
ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে লেখা আছে –
সুগন্ধায় নাসিকা পড়িল চক্রহতা ।
ত্র্যম্বক ভৈরব তাহে সুনন্দা দেবতা ।।
এখানে দেবী জগদম্বা সতী দেবীর নাসিকা পতিত হয়েছিল । ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে এই শক্তিপীঠের নাম পাওয়া যায় । শিবচরিতে ও পীঠনির্ণয়তন্ত্রে এই সতী পীঠের কথা আছে । তবে কালিকাপুরান, দেবী ভাগবত, কুব্জিকা তন্ত্রে অবশ্য এই পীঠ সম্বন্ধে কিছুই বলা হয় নি । পণ্ডিত দের মতে এই শক্তিপীঠ বাংলাদেশের বরিশালে অবস্থিত । বরিশাল জেলা শহর থেকে ২৭ কিমি উত্তরে শিকারপুর গ্রামে এই পীঠ অবস্থিত। নদীমাতৃক বাংলাদেশে এক সময় পোনাবালিয়া ও সামরাইলের পাশ দিয়ে পবিত্র সুগন্ধা নদী প্রবাহিত হতো । কিন্তু কালের করাল গ্রাসে আজ সে নদী নাব্যতা, স্রোত হারিয়ে ক্ষীণ স্রোতা হয়েছে- যার নাম সোন্ধ । তবে মা কিন্তু এখনও আছেন। সুগন্ধা নদীর পূর্ব পাড়ে দেবীপীঠ পশ্চিম পাড়ে দেবীর ভৈরব ত্র্যম্বকেশ্বর বিরাজমান । একসময় এখানে গভীর জঙ্গল ছিল। দিনেরবেলাতেও লোকজন যেতে ভয় পেতেন । সেই সময় শিকারপুরের খুব ধনী ভূস্বামী শ্রীরাম রায় একদিন স্বপ্নে মহাদেবের আদেশ পেলেন । মহাদেব স্বপ্নে তাঁকে জানালেন – “ তোমার রাজত্বের সামরাইলে জঙ্গলে এক ঢিপির মধ্যে আমি অবস্থান করছি। তুমি সেখান হতে আমাকে উদ্ধার করো। তোমার মঙ্গল হবে।”

স্বপ্ন দেখা মাত্রই পরদিন রাম রায় প্রচুর লোকজন নিয়ে সেই জঙ্গলে তল্লাশি করতে গেলেন । সে সময় জঙ্গলে কিছু রাখাল বালক গোরু চড়াচ্ছিল্ল। অত লোকজন পাইক পেয়াদা দেখে রাখাল বালক গন ভয় পেয়ে পালাতে উদ্যত হলে রাম রায় অভয় দিয়ে বলল- “ওহে রাখাল বালক গন। আমাকে দেখে ভীত হয়ে পালানোর দরকার নেই, আমি এখানে জঙ্গলের মধ্যে কেবল একটি অলৌকিক ঢিপির খোঁজ করতে এসেছি।” রাখাল বালক গন এইরকম একটা অলৌকিক ঢিপির সন্ধান জানতো । তারা একটা ঘটনা বলল। ঘটনা টা এই । রাখাল দের গোরু গুলো আগের মতো আর দুগ্ধ প্রদান করছিল না। গোরুর মালিক ভাবল রাখাল রাই নিশ্চয়ই দুধ চুরি করে গোরু চড়ানোর সময় । একদিন গোরুর মালিক ভাবল হাতে নাতে চোর গুলোকে ধরবে । তারপর রাজার কাছে নালিশ জানাবে ।
এই ভেবে একদিন মালিক রাখাল দের পিছু নিলো চুপিসারে । জঙ্গলে গোরু গুলো যখন তৃন খাচ্ছিল্ল- মালিক লুকিয়ে দেখছিল। হঠাত মালিক দেখলো গোরু গুলো একে একে জঙ্গলে ঢুকে একটা উচু ঢিপিতে নিজেরাই বাঁট থেকে দুধ দিচ্ছে। মালিক ভাবল গোরু গুলো এমন করছে কেন? ঐ ঢিপিতে কি আছে ? ভেবে মালিক নিজে জঙ্গলের শুকনো কাঠ খড় জোগার করে ঐ ঢিপিতে আগুন ধরিয়ে দিলো । লেলিহান আগুনের শিখা যখন লকলক করে উঠছিল- মালিক দেখলো একটি কৃষ্ণ বর্ণা বালিকা সেই ঢিপি থেকে দৌড়ে পাশে জলাশয়ে প্রবেশ করলো । রাখাল দের কাছে এই শুনে ধনী রাম রায় সেই ঢিপির কাছে পৌছে খনন করার আদেশ দিলো। খনন করতেই লিঙ্গ মূর্তি বের হল । রাম রায় ভাবল এই লিঙ্গ তিনি গৃহে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে নিত্যসেবা করবেন । কিন্তু আশ্চর্য কত শত লোক মিলেও সেই লিঙ্গ তুলতে পারলো না । সেইদিন রাতে ভগবান ভোলানাথ আবার রাজাকে স্বপ্নে বললেন- ‘আমাকে ঐখানেই প্রতিষ্ঠা করো । মনে রাখবে আমার বিহারের স্থানে কোনো আচ্ছাদন থাকবে না।’ বিত্তশালী রাম রায় সেই ভাবেই বাবাকে স্থাপন করে নিত্য পূজার ব্যবস্থা করলেন ।

অপরদিকে আর একটি ঘটনা । শিকারপুর গ্রামে পঞ্চানন চক্রবর্তী নামে একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বাস করতো । সে ছিল সৎ, ধার্মিক, মানব প্রেমিক। একদা স্বপ্নে মা কালী তাঁকে দর্শন দিয়ে বললেন- “সুগন্ধার গর্ভে আমি শিলারূপে বিরাজিতা আছি। তুমি আমাকে সেখান থেকে তুলে এনে প্রতিষ্ঠা ও পূজোর ব্যবস্থা করো।” চক্রবর্তী মশাই সেই স্বপ্নাদেশে দেখানো জায়গা থেকে মায়ের পাষাণ মূর্তি তুলে প্রতিষ্ঠা ও নিত্য পূজা করতে লাগলেন । গ্রামের লোকেরা এসে যে যা পারে- তাই দিয়ে মায়ের সেবা করতে লাগলো । দুঃখের বিষয় সেই মূর্তি চুরি হয়ে গেছে । বর্তমানে সেখানে দেবী উগ্রতারার মূর্তি বিরাজিতা। তাঁকেই দেবী সুগন্ধা রূপে পূজা করা হয় । দেবী খড়্গ, খেটক, নীলপদ্ম, নর মুণ্ডের কঙ্কাল ধারন করে আছেন । মাথার ওপর কার্ত্তিক, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব , গণেশ বিরাজমান । এই মূর্তি বৌদ্ধ তন্ত্রের উগ্রতারার । এথেকে প্রমানিত ভারতবর্ষের বঙ্গপ্রদেশে প্রাচীন কাল থেকেই তন্ত্র সাধনার ব্যপক প্রচার ছিল । বৌদ্ধ তন্ত্রে তারা সাধনার বিশেষ প্রনালী দেখা যায়- সেই মতেই তারা মায়ের উপাসনা হয়। বাংলায় অনেক প্রাচীন কালী মন্দির, দেবী মন্দির দেখা যায় । বাংলায় শক্তি সাধনা হতো । যাই হোক সুগন্ধা শক্তিপীঠের দেবীর প্রাচীন মন্দির এখন আর নেই। এখন যেটা আছে সেটা নবনির্মিত । তবে সতী মায়ের প্রস্তরীভূত দেবী অংশ এখানে কোথায়- তা কেউ জানেন না। একমাত্র মা জানেন । অভয়দায়িনী, শিবশক্তি, আদিভূতা সনাতনী সুগন্ধা মায়ের চরণে অনেক প্রনাম ।

Sunday, October 15, 2017

মহাদেবের পুজোর নিয়মাবলী


মহাদেবের পুজোর নিয়মাবলী
শিব ঠাকুরের পুজো করলে মনের মত বর জুটবে—এই কথা আমি, আপনি বা প্রায় সকল মহিলারাই ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছেন| কেউ পুজো করে নিশ্চয়ই ফল স্বরূপ মনের মত বরটিও পেয়ে গিয়েছেন! কিন্তু শুধু মনের মত বর ছাড়াও যদি আপনি মহাদেবকে তুষ্ট করতে পারেন তাহলে কিন্তু জীবনে সকল আশাই আপনার পূর্ণ হবে|
কেমন পুজো শিবের পছন্দ?
দেবাদিদেব মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য কিন্তু মোটেও পুজোর জাঁক-জমক বা অতি আড়ম্বরপূর্ণ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয় না। কারণ মহাদেব খুব অল্পেই খুশি হন| শুদ্ধ মনে ভক্তি ভরে ডাকলেই তিনি আপনার প্রার্থনা শুনতে পাবেন। কিন্তু আপনার মন যদি কলুষিত হয় এবং ভক্তির অভাব হয় তাহলেই কিন্তু বিপদ। কারণ এমনিতে খুব শান্ত এই ভগবান যদি রেগে গিয়ে বা অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁর তৃতীয় নয়ন প্রজ্জ্বলিত করেন, তাহলেই বিশ্ব-সংসার ছারখার হয়ে যাবে!
তাই বলছি আপনি যদি মহাদেবের বন্দনা করতে চান, তাহলে আজকের লেখাটি পড়ে জেনে নিন ঠিক কীভাবে আপনি মহাদেবের পুজো করবেন|
পুজোর সামগ্রী
আগেই বলেছি মহাদেব বড়ই আড়ম্বরহীন জীবনযাপন করেন। তাই তাঁর পুজোর জন্য শুধু আপনার মনের অপার বিশ্বাস, ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছুই চাই না| তবুও কী কী বস্তু আপনার প্রয়োজন হবে এই পুজোর জন্য তা একবার জেনে নিন|
আমরা সাধারণত মহাদেবের মূর্তি পুজো করি না। এক্ষেত্রে শিবলিঙ্গকেই তাঁর প্রতিরূপ হিসেবে পুজো করা হয়| তাই আপনিও যদি আপনার বাড়িতে শিব পুজো করতে চান সেক্ষেত্রে শিবলিঙ্গ আপনার প্রয়োজন হবে| এছাড়া চাই বেল পাতা| মহাদেবের সবথেকে প্রিয় বস্তু হল এই বেল পাতা| শুধু এই দিয়েই ভক্তি ভরে ডাকলে আপনি মহাদেবকে তুষ্ট করতে পারবেন|
তামার বা পাথরের বাটির প্রয়োজন হবে, কারণ শুধু মাত্র এই দুটি পাত্রেই শিবলিঙ্গটি স্থাপন করা হয়| এছাড়া কোশাকুশি,দীপ, ধূপ, শিবলিঙ্গটিকে স্নান করানোর জন্য একটি ঘটিতে জল ও অপর একটি ঘটিতে কাঁচা দুধ, সাদা চন্দন, পানীয় জল, নৈবেদ্য এবং প্রসাদ দেওয়ার জন্য ছোটো থালা এবং গ্লাস লাগবে।
বিষ্ণু মন্ত্র পাঠ
প্রথমে স্নান করে পুজোর স্থান পরিষ্কার করে দীপ-ধূপ জালিয়ে পুজোর আসন পেতে পুজোয় বসতে হবে| মনে রাখবেন আপনার শিবলিঙ্গ যেন উত্তর দিকে মুখ করে বসানো থাকে| প্রথমে আসনে বসে মহাদেব ও আদি শক্তি অর্থাৎ দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাতে হবে| এরপর আপনার ইষ্ট দেবতাকে স্মরণ করে ইষ্ট মন্ত্র জপ করতে হবে| এরপর বিষ্ণু মন্ত্র উচ্চারণ করে পুজো আরম্ভ করতে হবে|
জল শুদ্ধি
শিবলিঙ্গের সামনে কোশাকুশিতে জল রেখে আপনাকে জল শুদ্ধি করতে হবে| কারণ এই জল পুজোর সামগ্রীর শুদ্ধিকরণের কাজে এবং পুজোর কাজে ব্যবহৃত হবে| ঠাকুরের আসনের সামনে আপনার হাতের বাঁ দিকে কোশা রেখে তাতে ডান হাতের মধ্যমা অঙ্গুলিটি স্পর্শ করিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে সমগ্র তীর্থকে জলে আগমনের প্রার্থনা জানিয়ে জলকে শুদ্ধ করা হয়| এবার একটি ফুলে সাদা চন্দন লাগিয়ে তা দিয়ে শুদ্ধ জল নিজের মাথায় ছিটিয়ে নিন এবং সমগ্র পুজো সামগ্রীতে ছিটিয়ে নিন| এতে সব শুদ্ধ হয়ে যাবে|
স্নান
এরপর শিবলিঙ্গকে স্নান করাতে হবে| যে জলে শিবলিঙ্গের আচমন বা স্নান হবে তাতেও কিন্তু শুদ্ধ জল ছিটিয়ে নিতে হবে| একটি তামার পাত্রে শিবলিঙ্গটি রেখে প্রথমে কাঁচা দুধ এবং তারপর জল ঢেলে শিবলিঙ্গটিকে স্নান করাতে হবে নির্দিষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ করে| এরপর শিবলিঙ্গ নির্দিষ্ট তামার বা পাথরের পাত্রে বসাতে হবে|
ধ্যান
এবার কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে মহাদেবের ধ্যান করে তারপর শিবলিঙ্গের মাথায় সাদা চন্দন মাখা বেল পাতা অর্পণ করতে হবে| এবারে ফুল ও বেল পাতা মহাদেবের চরণে অর্পণ করুন| দীপ ও ধুপ দেখিয়ে ভক্তি মনে মহাদেবের মন্ত্র উচ্চারণ করতে হবে| সব শেষে জল ও প্রসাদ দিয়ে প্রণাম করুন|
দেবাদিদেব মহাদেব হলেন এই জগতের অধিপতি, তাঁর অংশ এই বিশ্বের সব কিছুতেই বর্তমান| তাই আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ভগবানের অস্তিত্ব বর্তমান| নিজের মনকে শুদ্ধ রাখলে এবং অন্যের প্রতি শ্রধা ও ভালবাসা রাখলেই কিন্তু ভগবান তুষ্ট হন| কোনো জাঁক-জমক বা লোক দেখানো আড়ম্বর না করে নিজের মনের পাপ ও অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে সহজ সরল মনে ডাকলেই কিন্তু মহাদেবের আশীর্বাদ প্রাপ্তি ঘটবে|

Saturday, October 29, 2016

নারায়ণ পূজার্চ্চনার নিয়ম এবং পদ্ধতি


 নারায়ণ পূজার্চ্চনার নিয়ম এবং পদ্ধতি
সত্যনারায়ণ পূজার সঙ্গে বাঙালী অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একবারও সত্যনারায়ণ হয়নি এরকম বাঙালী বাড়ি খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। বাড়িতে কোন শুভকাজের আগে বা পরে সত্যনারায়ণ পূজা বা নতুন বাড়িতে প্রবেশের আগে সত্যনারায়ণ পূজা, যেকোনো শুভ কাজেই নারায়ণ দেবতার আশীর্বাদ আমাদের চাইই চাই। কিন্তু যারা সত্যনারায়ণ পূজার নিয়মবিধি সেভাবে জানেন না, তাঁদের জন্যই থাকল সত্যনারায়ণ পূজার কিছু নিয়মবিধি।

নারায়ণ পুজো পূজা শুরুর আগের কিছু নিয়ম
নারায়ণ পূজায় তেমন বাহুল্য নেই বললেই চলে।তাই এই পূজার আয়োজন খুব সহজ। যে যার সাধ্য মত আয়োজন করে। যেকোনো পূর্ণিমার তিথিতেই এই পূজা করা যায়। অনেকে বাড়ির পরিবেশ শুদ্ধ রাখতে, প্রতিটা বড় পূর্ণিমাতেই পূজা করে থাকেন।
পূজার আগের নিয়ম বলতে, সবচেয়ে আগে পূজার স্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করে রাখুন। পরিষ্কার করে যেখানে ঘট পাতবেন, সেখানে আলপনা দিয়ে দিন। সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিন। ঘটে আমপাতা, শিষ ডাব দিন। অবশ্যই ঘটে ও ডাবে স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে দেবেন। বিজোড় সংখ্যক আমপাতা রাখবেন। এতে সিঁদুরের ফোঁটা দেবেন।
এরপর নৈবেদ্য সাজিয়ে দেবেন। একটি থালায় তিনটি জায়গায় একটু করে চাল, ও তার সঙ্গে কলা, বাতাসা, অন্যান্য ফল, তার ওপর সিকি মানে কয়েন, পঞ্চ শস্য এসব দিয়ে সাজান। পঞ্চ শস্য মানে পাঁচ রকম শস্য। এই ভাবেএকটি থালায় তিনটি ও আরেকটি থালায় পাঁচটি নৈবিদ্য সাজিয়ে রাখুন।
সিন্নির জন্য একটি গামলায় ময়দা, গুড়, দুধ, খোয়া ক্ষীর, একটু নারকেল কোরা, কাজু, কিশমিশ ঠাকুরের সামনে রাখবেন। পূজার পর ঠাকুরমশাই সিন্নি তৈরি করবেন। এছাড়াও নারায়ণের ছবির দু’পাশে দুটো পান পাতা রাখুন। এর ওপর একটা সুপারি, একটা কয়েন, একটা কলা রাখুন।

পূজা শুরু
নারায়ণ পূজার জন্য প্রথমে নারায়ণ শিলা স্থাপন করতে হয়। চিন্তা নেই, সেটি আপনার ঠাকুরমশাই সঙ্গে করে আনবেন। এবং ইনিই প্রতিস্থাপন করবেন। সেদিন সারাদিন ওই নারায়ণ শিলা থাকবে। পরদিন ঠাকুর মশাই সুতো কেটে সেটি নিয়ে চলে যাবেন। নারায়ণ শিলা স্থাপন করে ও নারায়ণ দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে পূজা শুরু করা হয়। সঙ্গে মা লক্ষ্মীকেও ফুল দেবেন, প্রণাম জানাবেন।
এরপর আপনার সমস্ত আয়োজন তাঁকে নিবেদন করার পালা। এই সাধারণ পূজার পর অঞ্জলি। অঞ্জলি শেষ হয়ে গেলে হোম। হোম-যজ্ঞের জন্য ছোট ছোট করে বেশ কয়েকটি হোমের কাঠ,একটি পাত্রে ঘি, ৫১টি বেলপাতা, একটি লাল চেলি কাপড়, একটু দুধ একটি কলা ও একটি সন্দেশ এবং হোমকুণ্ড রেডি রাখবেন। যজ্ঞ শেষে দুধ ঢেলে যজ্ঞ শেষ হবে। এবং সবাই যজ্ঞের টিপ পড়বেন। এইসব কিছু দশকর্মার দোকানে পেয়ে যাবেন। এটিই হল নারায়ণ পূজার নিয়ম।
তাহলে দেখলেন নারায়ণ পূজার আয়োজন করা কত সহজ। শুধু শুদ্ধ, শান্ত মনে পূজার আয়োজন করুন। আয়োজন সামান্য হলেও দেবতা নারায়ণের আশীর্বাদ প্রবেশ করবে আপনার ঘরে।

 
Design by দেবীমা | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes